কলকাতার চটকল শ্রমিকের সংগ্রামে ইউনিয়নগুলোর অন্তর্ঘাত (স্যাবোটাজ)

 কলকাতার নিকটবর্তী ৫২ টি জুটমিলের প্রায় আড়াইলক্ষ শ্রমিক ২০০৯-র ডিসেম্বরের শুরুতেই ধর্মঘটে নামে। মজুরী বাড়ানো, অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত বহুসংখ্যক শ্রমিকের স্থায়ীকরণ, অবসরকালীন সুযোগ সুবিধা প্রদান এবং জীবনযাপনের মান উন্নয়ন ও কারখানায় নানান অসুবিধাজনক পরিস্থিতির বদল ইত্যাদি নানা দাবীতে এই ধর্মঘট। সর্বোপরি, বকেয়া বেতন আদায়, স্বাস্থ্য বীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য খাতে কেটে নেওয়া টাকা শ্রমিকদের নামে যথাযথভাবে জমা দিতে বাধ্য করা ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম দাবী। দুমাস ধ’রে চলার পর ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০১০ ইউনিয়নগুলো ধর্মঘট প্রত্যাহার করে এবং শ্রমিকদের কাজে যেতে নির্দেশ দেয়, যদিও ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে কোন দাবী আদায়ে তারা সমর্থ হয়নি। বরং এই পরাজয় শ্রমিকশ্রেণির ওপর আর একটা আক্রমণের মঞ্চ তৈরি করল।

চটকল শ্রমিকদের এই ধর্মঘট প্রতিবছরেই চটকল শ্রমিকদের এই সাম্প্রতিক স্ট্রাইক প্রথম নয়। প্রায় প্রতি বছর তাঁরা ধর্মঘট করেন। ২০০২, ২০০৪, ২০০৭-এ ৬৩ দিনের টানা ধর্মঘট এবং ২০০৮-এর ১৮দিন ধর্মঘটের কথা আমরা মনে করতে পারি। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই শ্রমিকসাধারণের কর্তপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার প্রয়াস বা সামান্য দাবী আদায়ের প্রচেষ্টা ইউনিয়ন এবং চটকল কর্তপক্ষের মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলে ব্যর্থ হয়েছে। চটকল মজুরদের বারংবার বিক্ষোভে ফেটে পড়ার কারণ নিহিত আছে তাদের কর্মক্ষেত্রের অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে, নিহিত আছে স্ট্যালিনিস্ট এবং অন্যান্য ইউনিয়ন ও পার্টির দমন পীড়ণের মধ্যে যাদিয়ে তারা শ্রমিকদের বিক্ষোভকে নিজেদের মুঠির মধ্যে রাখতে চায়। অনেক চটকল চালানোর ক্ষেত্রে স্থায়ী কিছু সমস্যা থেকে যাওয়াও শ্রমিকদের আন্দোলনে যেতে বাধ্য করে। চটকল মজুরদের বেতন অত্যন্ত কম। এমনকি স্থায়ী শ্রমিকদের বেতন মাসে ৭০০০ টাকা মানে কিনা মোটামুটি ১৫০ ইউএস ডলার বা বর্তমান হিসাবে ১০০ ইউরোর কাছাকাছি। প্রতিটা মিলে একতৃতীয়াংশের বেশি মজুর অস্থায়ী বা চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত যাদের বেতন স্থায়ী শ্রমিকদের অর্ধেকের কম, মানে ডেলি ১০০ টাকা। পরন্তু, যেদিন কাজ করানো হবে শুধু সেইদিনের বেতনই দেওয়া হবে! এইসব অস্থায়ী কর্মীরা জীবনের অধিকাংশ সময় একটা মিলে কাজ করেই জীবন কাটিয়ে দেন; তা সত্ত্বেও তাঁদের স্থায়ী করা হয় না কেননা মালিক তা চায় না। এমনকি শ্রমিকেরা তাদের মাসিক বেতন নিয়মিত এবং পুরোপুরি  পান না; আন্যান্য দেয় বেনিফিটের টাকাও মেলে না।এইসব টাকা বছরের পর বছর জমতে থাকা সত্ত্বেও মেটানো হয় না। এমনকি আইনসঙ্গতভাবে স্বাস্থ্যবীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা দেওয়ার জন্য টাকা কেটে নিলেও অনেকসময় ম্যানেজমেন্ট সেটাকা শ্রমিকদের নামে সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরে জমা করেনা। এ বিষয়ে সংঘবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও মালিকেরা সেই সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখায়। শ্রমিকদের ওপর আরো বেশিমাত্রায় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য চাপিয়ে দেবার জন্য মালিকেরা লক-আউট ঘোষণা করে, বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বসেরা একাজ চালিয়ে যেতে পারে কারণ চলতি বামফ্রন্ট সরকার সহ যত স্ট্যালিনিস্ট ও্ অন্যান্য ইউনিয়নগুলো তাদেরই দোসর। প্রতিটা চুক্তির ক্ষেত্রে সরকার নিজেই একটা পার্টি, তবুও কোন চুক্তিলাগু করার জন্য সরকার কোন প্রয়াসই নেয় না। সোজা কথায় সরকার নিজস্ব শ্রম আইন নিজেই ভাঙে। এইসবের ফলে শ্রমিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে, যার ফল হ’ল তাদের এই বারবার করে সংগ্রামে নামা। 1990-র প্রথমদিকে ভিক্টোরিয়া এবং কানোরিয়া জুটমিলের শ্রমিকদের মধ্যে এই তীব্র ক্ষোভের প্রকাশই আমরা দেখি; এখানে তারা প্রচলিত সমস্ত ইউনিয়নকে বয়কটই শুধু করেনি, এমনকি ভিক্টোরিয়ার শ্রমিকরা সমস্তধরণের ইউনিয়নের অফিস আক্রমণ করে, অফিস ভাংচুড় করে, মারধর করে ইউনিয়ন বসেদের। কানোরিয়ার শ্রমিকেরা সমস্ত প্রচলিত ইউনিয়ন বয়কট করে এবং বহুদিন ধ’রে মিল দখল করে। কিন্তু বহু বছর ধ’রে পশ্চিমবঙ্গ বামপন্থীদের মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে আছে; গত ৩২ বছর ধরে রাজত্ব করা স্ট্যালিনিস্ট হায়নারাই শুধু আছে তা নয়, এদের পাশাপাশি আছে বিরোধী বামপন্থী দলবল, আছে এনজিও, বামপন্থী বুদ্ধিজীবির দল। ফলে, কানোরিয়া বা ভিক্টোরিয়ার শ্রমিকদের প্রচলিত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার প্রয়াসকে সরকার বিরোধী বামপন্থীরা খুব দ্রূত ক্যাপচার ক’রে নেয়; আন্দোলন বেপথু হয়ে পড়ে। প্রচলিত ইউনিয়নগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকের স্বতঃস্ফূর্ত্ত ঘৃণাকে ব্যবহার ক’রে এরা  নতুন মোড়কে সেই একই ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির খপ্পরেই তাদের এনে ফেলে। এখনও অব্দি এই হ’ল পশ্চিমবাংলার চটকল শ্রমিক সংগ্রামের করুণ পরিণতি।এই বাস্তবতা থেকে এটা বোঝা যায় শ্রমিক সংগ্রামে সত্যিকারের শ্রমিক শ্রেণির চিন্তাধারা গড়ে তোলা কী ভীষণভাবে প্রয়োজনীয়। বর্তমান ধর্মঘট পাঁচ পাঁচটা ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর শ্রমিকদের বিক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ২০টা ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে ১৪ই ডিসেম্বর থেকে ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হয়। বকেয়া বেতন মেটানো, স্বাস্থ্য বীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে দেয় টাকা সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরে জমা করা এবং বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি দাবীতে এই ধর্মঘট ডাকা হয়। খবর অনুযায়ী গড় পরতায় শ্রমিক পিছু ৩৭০০০ টাকা পর্যন্ত বকেয়া আছে যা প্রায় তাদের ছ মাসের বেতনের সমান। এগুলো না দেওয়া মানে শ্রমিকের পয়সা স্রেফ চুরি করা। পরন্তু স্বাস্থ্য বীমা এবং পিএফে টাকা না দেওয়ার অর্থ চিকিৎসা পরিসেবা না পাওয়া, রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট আটকে যাওয়া। ধমর্ঘটের ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকার চাপের মুখে পড়ে, তাদের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বীজনেস স্যান্ডার্ড পত্রিকা অনুযায়ী চলতি অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অন্যান্য সেক্টরে যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে তারাও ধর্মঘটীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে দিতে পারে এমন একটা আশঙ্কা বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান উড়িয়ে দিচ্ছে না। তাছাড়া এর ফলে মালক পক্ষ লোকসান করছে। বীজনেস স্যান্ডার্ড অনুযায়ী (১৬ ০২ ২০১০) ৬১ দিনের স্ট্রাইকে মোট ২২ বিলিয়ন টাকা (৪৭৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার) ক্ষতি হয়েছে। কেন্দ্র ও বাম ফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকার সহ আন্যান্য পার্টি এবং ইউনিয়ন মিলিতভাবে ধর্মঘট দমনের কাজে হাত লাগায়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা  দেখানোর জন্য সব রাজনৈতিক দলই ধর্মঘট সাপোর্ট করেছে(তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি বাদে); আর বাস্তবে তাদের নিজ নিজ ছাতার তলায় থাকা ইউনিয়নগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে যেমন করেই হোক শ্রমিকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা “সুবিধাজনক” অবস্থানে আনতে। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাদের দল সিপিএমের অধীন বেঙ্গল চটকল মজদুর সঙ্ঘের নেতা গোবিন্দ গুহকে পরামর্শ দিয়েছেন শ্রমিকদের সব দাবী দাওয়া মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা না করতে। মিস্টার গুহ সংবাদ মাধ্যমকে নিজেই জানিয়েছেন, “ আমি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি; তিনি সব দাবী শুনেছেন; তিনি বলেছেন এইসব দাবী মেনে নিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়াটা খুব শক্ত হবে।“ উল্লেখ্য, সবচেয়ে বেশি সংখ্যার শ্রমিক সিপিএমের এই ইউনিয়নের সদস্য।  শুধু পশ্চিমবাংলার প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস তার অধীন ট্রেড ইউনিয়নকে নির্দেশ দিয়েছে ধর্মঘটে যোগ না দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে। তৃণমূলের মতে “কারখানা অচল” করে দেয় এমন কোন কিছুতেই থাকা চলবে না। বড় বড় বীজনেস হাউজের পক্ষে এই অবস্থান যথেষ্ট সন্তোষজনক এবং এজন্য তৃণমূলের কর্মকান্ডে ওদের অর্থসাহায্য করার কথাও শোনা যাচ্ছে। শ্রমিকদের এই লড়াকু মনোভাবকে বেপথু করছে ট্রেড ইউনিয়ন অন্যান্য মিলগুলোর  শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার রাস্তাতেই হাঁটতে দেয় না ইউনিয়নগুলো; কলকাতার অন্যান্য নানা সেক্টরের শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার পথে তারা প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রমিকদের প্যাসিভ, পরস্পর বিচ্ছিন্ন ক’রে রেখে ইউনিয়ন নেতারা শুধু আশ্বস্ত করে যে কিছু করার দরকার নাই, অপেক্ষা কর, নেগোসিয়েসন হবে, মালিককে দাবী মানাতে বাধ্য করব। বাস্তবে, বকেয়া বেতন মেলে না, মজুরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুত পরিমানটাও নেহাতই সামান্য থেকে যায়। বলা হয়, বকেয়া বেতন কিস্তিতে বেশ কিছু মাস ধ’রে মেটানো হবে। ডিয়ারনেস আলাউয়েন্স টাও মাসিক মাইনের সঙ্গে দেওয়া হবে না, সেটাও হবে তিনমাস অন্তর। পরিবর্তে ইউনিয়ন কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে? পরবর্তী তিন বছর শ্রমিকেরা কোন ধর্মঘট করবে না!! সিপিএমের ইউনিয়ন নেতা মিস্টার গুহ বলছেন “ পরবর্তী তিন বছর চটকলে কোন ধর্মঘট হবে না।“ এথেকে মালিকেরা চটকল মজুরদের নিশ্চিন্ত মনে আক্রমন চালিয়ে যেতে পারবে: চাকরি ছাঁটাই, মজুরি সংকোচন হবে, প্রাপ্য মজুরি দিচ্ছে না, দেবেও না, লিভিং কনডিশন, ওয়ার্কিং কনডিশন আরো খারাপ হবে কিন্তু কিছু বলা যাবে না! এই হল ইউনিয়নের শ্রমিক দরদী ভূমিকা। এই ভয়ংকর বেইমানি শ্রমিকদের সাথে করা হ’ল: এই দীর্ঘ ধর্মঘটের সময় ধরে বেতন না পেয়েও ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ফল শ্রমিকেরা পেলেন। এক নিদারুণ হতাশা, যন্ত্রণা এবং ঘৃণা ও রাগের আগুন জ্বলতে থাকল শ্রমিকদের মনে। এই তীব্র রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটল আকস্মিক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর ভেতর দিয়ে ধর্মঘট শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মজুরদের ক্ষোভ ফেটে পড়ল ইউনিয়ন অফিসগুলো আর তার নেতাদের আক্রমণের ভেতর দিয়ে। চৌঠা মার্চ ২০১০, উত্তর চব্বিশ পরগনার জগদ্দল জুট মিলের মজুরদের বিরুদ্ধে মালিকপক্ষ নতুন আক্রমণ নামিয়ে আনল। স্থায়ী মজুরদের করণীয় স্থানান্তরণের কাজটা চুক্তিভিত্তিক মজুরদের হাতে তুলে দিতে চেষ্টা করা হ’ল। লোকাল ইউনিয়ন লিডারদের তোয়াক্কা না করেই, মজুরেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং এই্ পদক্ষেপ প্রতিহত করে। শ্রমিকদের এই প্রতিরোধ ভাঙতে এবং তাদের ভয় দেখাতে পরদিন মালিকেরা আকস্মিকভাবেই গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং সাসপেনসন নোটিশ দেয়। শ্রমিকেরা সকালের শিফটে কাজ করতে এসে দেখে এই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধর্মঘট করারর ফলে বেতন না পাওয়া, সবদিকথেকে অন্যায়ের শিকার হওয়া বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার শ্রমিক তৎক্ষণাৎ এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে: তারা শ্লোগান তোলে এখনি মিল খুলতে হবে এবং শ্রমিকদের কাজ করতে দিতে হবে।এই সময়েই ৫৬ বছর বয়েসী এক পুরোণো শ্রমিক আক্রমণের আকস্মিকতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং হার্ট আ্যাটাক হয়ে প্রায় তৎক্ষণাৎ মারা যান। এই ঘটনা শ্রমিকদের ভেতর রাগ ও ঘৃণার আগুন শতগুন বাড়িয়ে তোলে। তাঁরা বোঝেন যে এই সাসপেনশনের পেছনে অতি আবশ্যই ইউনিয়নগুলোর হাত আছে। ক্রুদ্ধ মজুরেরা সংগে সংগে (সরকারী বামপন্থী সিপিএম পরিচালিত) সিটু এবং (কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন কংগ্রেস পরিচালিত) আইএনটিইউসির অফিসে যান এবং অফিস ভেঙে তছনছ করেন।সিটুর লিডার ওমপ্রকাশ রাজবর মজুরদের হাতে মার খায়। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে ম্যানেজার এবং নেতাদের উদ্ধার করে। অবশ্যই পুলিশ শ্রমিকদের প্রতি ভায়োলেন্ট আচরণ করে, নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে সাধারণ মজুর ও তাদের ফ্যামিলির লোকজনদের। এরকম হিংসাত্মক কার্যকলাপ অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে না, তবু এই ঘটনা দেখায় যে মালিক এবং ইউনিয়নের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মধ্যে কি তীব্র রাগ এবং ধিক্কার জমা হয়ে আছে! কিভাবে এগোনো যায় জুট শিল্প বরাবরই সমস্যাদীর্ণ আর বর্তমানে তীব্রতর হতে থাকা বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব থেকে অন্যান্য সেক্টরগুলোর মতই জুট শিল্পও মুক্ত থাকতে পারে না। লাভ বজায় রাখা শুধু নয়, মিল মালিকদের লক্ষ্য আরো বেশি বেশি লাভ করা। এর একমাত্র উপায় শ্রমিকদের আরো আরো বেশি শোষণ করা, আর এজন্যই, তাদের কাজের পরিস্থিতি, জীবনযাপনের মানের ওপর আরো ভয়াবহ আক্রমণ নামিয়ে আনা ছাড়া আর কোন উপায় আজ নেই। জুট ওয়ার্কারদের আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তাঁরা প্রায়শই জঙ্গী আন্দোলন করেছেন, বীরের মত রুখে দাঁড়িয়েছেন অন্যায় ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে তাঁদের স্বার্থে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অন্যান্য সেক্টরে, কলে কারখানায় শ্রমিকদের সংগ্রামগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে চলবে না, বরং আন্দোলনে পরস্পরের সাথী হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিকদের সাহায্য সহযোগিতা সমর্থন ছাড়া আজকের দিনে বিচ্ছিন্নভাবে একটা সেক্টরের মজুরের লড়াই জয়যুক্ত হতে পারেনা। পরন্তু, ইউনিয়নের বিরোধীতা করতে গিয়ে হয় নিষ্ক্রিয় থাকা নয়তো এধরণের নৈরাজ্যমূলক ভায়োলেন্ট ঘটনা ঘটানো কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়। ইউনিয়ন  মালিক ও রাষ্ট্রের পক্ষেই থাকতে বাধ্য, এথেকে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষার কোন সম্ভাবনাই নেই, এই ব্যাপারটা শ্রমিককে বুঝতে হবে এবং সমস্ত ধরণের ইউনিয়নসংগঠনের খপ্পর থেকে বাইরে এসে নিজেদের আন্দোলন নিজেদের হাতেই নিতে হবে। স্বসংগঠন গড়ে তোলা,আন্দোলনের পন্থা পদ্ধতি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের সাধারণ সভা আয়োজন করা, স্থায়ী নেতৃত্বের বদলে যেকোন সময়ে প্রত্যাহারযোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন ক’রে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্যান্য কলে কারখানায় অফিসে আন্দোলনের সমর্থনে শ্রমিকভাইবোনেদের আহ্বান করা ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই আজকের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। নিরো,২রা মে ২০১০