ওবামা প্রশাসনের বিদেশনীতি - বন্ধুত্বের মুষ্টি‍ ! (Obama Administration's Foreign Policy—the fist of friendship)

 আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ বর্তমানে শত্রুদেশএবং তথাকথিত মিত্রদেশ উভয়দিক থেকেই একইরকমভাবে সমস্যায় জর্জরিত। বুশ প্রশাসনের ‘একলা চলো’ নীতির পরবর্‍তী পর্ষায়ে ওবামা নির্বাচিত হওয়ায় ধরে নেওয়া হয়েছিল যে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে তার অভিযানের কলাকৌশলের ভিত আরো মজবুত করতে কিছুটা বিলম্ব করার নীতিই নেবে। ওবামার শান্তিকামী ইমেজ এবং তার প্রশাসনের সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের দৃষ্টিভঙ্গী আর কূটনৈতিক প্রকৌশলগুলি আসলে ছিল দ্বিতীয় সারির প্রধান শক্তিগুলিকে নিজের মিলিটারী শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে শত্রুদেশগুলিকে প্রতিহত করার পদক্ষেপমাত্র। ইন্টারন্যাশনাল রিভিউয়ের ১৩৮ নং সংখ্যায় বলা হচ্ছে, “আমেরিকার মূল লক্ষ্যটি আসলে মিলিটারি শক্তির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করা। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উত্তরোত্তর কূটনৈতিক সম্পর্‍ক স্থাপনের জন্য ওবামার বন্ধুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলি তাৎপর্ষপূর্ণভাবে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিলম্বের লক্ষ্যেই পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে আগামীদিনে যে কারোর যে কোন বিষয়ে অনিবার্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা যায়। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী প্রয়োজনেই আমেরিকাকে বিভিন্ন দেশে তার সামরিক বাহিনীকে ছড়িয়ে রাখতে হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ করতে করতে তার বাহিনী এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে তার পক্ষে এখনই আর কোন নতুন যুদ্ধে লড়া সম্ভব নয়। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা, সহযোগিতা ও কূটনৈতিক পদ্ধতির উপর তাই   ঢাকঢোল বাজিয়ে খুব জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ওবামার এসব গালভরা বুলি ও নীতি আরো বেশি বেশি করে বুশ প্রশাসনের নীতির মতোই হয়ে উঠছে। বরং সেগুলিকে আরো ক্ষুরধার, আরো কার্ষকরী ও আরো ব্যাপক করে তোলা হয়েছে যাতে বর্তমানের  উত্তরোত্তর উত্তেজিত পরিস্থিতিকে  সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়।

যদি কোন ঘটনা এই নীতিগুলির আসল উদ্দেশ্য প্রমান বা স্পষ্ট করতে পারে তবে তা হলো হাইতিতে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পরেই আমেরিকার হাইতি আগ্রাসন। যেখানে আমেরিকার পেছনে লাগা সবকটি দেশের সরকার এবং তাদের এজেন্টদের ছাপিয়ে আমেরিকা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই ঘটনা বিশ্বের তাবৎ শক্তিগুলির প্রতি আমেরিকার পাঠানো এক ভয়াবহ বার্তা। ইরাকে সেনা প্রত্যাহার স্থগিত রাখা এবং আফগানিস্তানে আরও ত্রিশ হাজার সেনা মোতায়েন ছাড়াও আরো অনেক ঘটনা আছে যেগুলি আমেরিকার আধিপত্য আরো বেশি মজবুত করার প্রয়োজনীয়তা ও তার উপলব্ধিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ওবামার নীতিগুলি, যেগুলিকে বুশের একপেশে নীতি থেকে আলাদা বলে দাবী করা হচ্ছে সেগুলি হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। “A Blueprint For Pursuing The World We Seek”-নাম দিয়ে ঐ নীতিগুলির ব্যাখ্যা আরম্ভ হয়েছে ওবামারই  উক্তি দিয়ে- “ অন্যদের মধ্যে ভয় ধরানোর ক্ষমতা দিয়ে আমাদের দীর্‍ঘমেয়াদী নিরাপত্তা আসবে না; সেটা আসবে অন্যদের আশা-আকাঙ্খাগুলি পূরণ করার মাধ্যমে”। এহেন বক্তব্যের সার কথাটি হলো চীন, ভারত এবং রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্‍ক স্থাপন করা। কিন্তু রিপোর্টে আবার সাইবার অপরাধের মতো বিষয়টির ওপর দারুন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এইটা  চীন একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। সম্প্রতি আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্‍কের ব্যাপারে ভারতকে আমেরিকা রীতিমতো কড়াভাবে সমালোচনা করেছে। এর ফলে উল্টো ফলই ফলেছে। ভারতীয় বুর্জোয়ামহল চটে গিয়ে সান্ত্বনা খুঁজতে রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। আবার ককেশাস অঞ্চলে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে তীব্র উত্তেজনা রয়েছে। কিরঘিজস্তানে চুড়ান্ত অস্থিরতার সময় যখন সরকারের পতন ঘটে তখন সেখানে দুইপক্ষই তীব্রভাবে জ্বলে ওঠে। এই কিরঘিজস্তানে দুইপক্ষেরই বিমানঘাঁটিও রয়েছে। বুশ জমানার নীতিগুলির সাথে মূলগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই, ওবামার এই রিপোর্টেও আমেরিকার একতরফা বসিজ্‌ম চালিয়ে যাবার অধিকার কায়েম রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে যে কাউকে আগেভাগে আক্রমণ করার বিধ্বংসী নীতিকেও বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎআমেরিকা সর্বত্র সামরিক প্রভুত্ব বজায় রাখবে এবং এজন্যই সবার ‘গণতান্ত্রিক ও মানবিক’(!) অধিকার প্রতিষ্ঠার বাণী আউড়ে যাবে।  আসলে এই বাণী চীন, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে দেখে নেবার ইঙ্গিত। এই নীতিগুলি বুশের সেই পুরনো নীতিগুলি অবশ্য নয়, বরং পরিবর্তিত অস্থির পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য পুরনো নীতিগুলিরই পরিশোধিত রূপ। এই নীতিরই ছত্রছায়ায় গত বছরের শেষে আমেরিকার Central Command-এর প্রধান জেনারেল পেট্রিয়াস একটি আদেশে সই করেন যাতে আরো নিবিড়ভাবে , ব্যাপকতরমাত্রায় অন্যদের বিরুদ্ধে গোপন আক্রমন চালানো যায়। এসবের বিশদ তথ্য অবশ্য পাওয়া যাবেনা। তবে ২৫শে মে, ২০১০ তারিখের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় লেখা হয়েছে- “আমেরিকান সৈন্যরা বর্তমানে ইরান, ইয়েমেন, সিবিয়া, সোমালিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় রয়েছে”। ইরান স্পষ্টতঃ অভিযোগ জানিয়েছে যে ঐ এলাকায় অস্থিরতা উস্কে দেবার জন্য আমেরিকা ও ব্রিটেন বিশেষ বাহিনী পাঠাচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ৫ই জুন, ২০১০ তারিখে জানাচ্ছে যে বর্তমানে ৭৫টি দেশে আমেরিকান সৈন্য নিয়োজিত রয়েছে।অথচ গত বছর ওবামা যখন দায়িত্বে আসেন তখন ৬০টি দেশে আমেরিকান সৈন্য সক্রিয় ছিল। বিশেষ অভিযানের জন্য ওবামা বাজেট বৃদ্ধি করেছেন এবং সেনাকর্তারা হোয়াইট হাউসে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশী হাজিরা দিচ্ছেন।জনৈক অফিসার জানাচ্ছেন, এই সেনাকর্তারা এখন কথা কম বলে কাজ বেশি করছেন। আর এই উদ্দেশ্যেও লোহিত সাগর, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ভারত মহাসাগরের কোথাও কোথাও ব্যাপকভাবে সেনাশক্তি ও ঘাটি এলাকা বাড়িয়ে আমেরিকার ৫ম নৌবহরের অবস্থান ও অভিযানের ক্ষেত্রকে আরো সুরক্ষিত করার কাজ সবে শুরু হয়েছে।                                   কূটনীতি—যুদ্ধের অন্যরূপ(Diplomacy as war) র‍্যামসফেল্ডের পদাঙ্ক অনুসরণ ক'রে ‘গোপন’ অভিযানগুলিকে ‘প্রকাশিত গোপন’ অভিযানে রূপান্তর করাটা আসলে শত্রুদেশগুলির প্রতি আমেরিকার যুদ্ধঘোষনারই অংশ এবং মিত্রদেশগুলির প্রতি তা সতর্কবার্তাও বটে। আমেরিকার প্রশাসন খোলাখুলিই এটা বলেছে।এই একই পদ্ধতিতে ওবামা প্রশাসন কূটনীতিকেও ব্যবহার করছে। এই কূটনীতি আসলে যুদ্ধের একটা দিক, সাম্রাজ্যবাদের একটা দিক। বিপুল জনমতে নির্বাচিত জাপানের প্রধানমন্ত্রী যখন কাঁধ থেকে আমেরিকার জোঁয়াল নামিয়ে জাপানের জন্য আরো স্বাধীনভাবে চলাফেরার প্রস্তাব দিলেন, জাপানে আমেরিকার বিমানঘাঁটি বন্ধের কথা বললেন, তখন আমেরিকান প্রশাসন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাল- বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ক'রে তোলার বিষয়ে। জাপানী প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতিয়াসকে ওয়াশিংটন সফরকালে জনসমক্ষে হেয় করা হয়। সংবাদপত্রের খবর ওবামা তাঁকে নাকি বলেছেন, “ তুমি সময়ের আগে দৌড়াতে চাইছ”( সোজা কথায় ক্ষমতার বাইরে গিয়েনিজের মতো চলতে চাইছ)। আমেরিকার কূটনৈতিক দাপটে, গালিগালাজপূর্ণ অপমানে আর জাপানসহ এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে হাতিয়াস একদম চুপসে যান এবং ক্ষমা চেয়ে পুরনো পথে ফিরে আসেন। গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মহিমা তাহলে বোঝাই গেল। জাপানের মতোই অবস্থা হয় ব্রাজিল ও তুরস্কের। ইরানের ইউরেনিয়াম তুরস্কে আনার জন্য ইরানের সঙ্গে তাদের যে চুক্তি হয় তার জন্য তাদের তীব্র সমালোচনা করে আমেরিকা। অথচ চুক্তিটি UN-এর সংশ্লিষ্ট খসড়া পরিকল্পনা মেনেই হয়েছিল এবং ঐ খসড়া পরিকল্পনাটি মেনে নেওয়ার জন্য আমেরিকা ও তার অনুরাগীরা বারেবারেই ইরানকে অনুরোধ করেছিল। আন্তর্জাতিক  সহযোগিতার হাত বলতে কি তাহলে এটাই বোঝায়? ব্রাজিল ও তুরস্ককে এই যে বাধা দেওয়া হল তার পিছনে কারণটি কী? কারণটি হলো ব্রাজিল ও তুরস্ক দুটি দেশই ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত UN প্যাকেজের বিরোধিতা করেছিল যে প্যাকেজটি রূপায়িত করতে আমেরিকা পাঁচমাস ধরে চেষ্টা করছিল। ঐ প্যাকেজটিতে কী আছে? আছে অর্থনৈতিক অবরোধ, অস্ত্র সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, এবং UN-এর সদস্যদের প্রতি ইরানের কাজকর্মের দিকে নজর রাখার জন্য সতর্কবার্তা; ইরানের  জাতীয় জাহাজ নির্মাণ কারখানা, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ বিপ্লবী প্রহরীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য বস্তুগুলিকে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীকেও আক্রমণের নিশানা করা হয়। এছাড়াও আমেরিকাকে সাহায্য করতে ইউরোপীয় শক্তিগুলির আরো বেশী অনুদান এবং মিলিটারী শক্তি না দেওয়ার জন্য, আমেরিকাকে আরো   বেশী সমর্‍থন না করার জন্য ইউরোপের দেশগুলিকে কূটনৈতিক রাস্তায় যথেচ্ছ অপমানজনক সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সেই সাহায্যের খুব বেশি আশা নেই কেননা এরা সবাই একে অন্যের ঘাড় মটকাবার চেষ্টা করছে।   সমস্যা,সমস্যা  আর সমস্যা (Trouble, trouble and trouble) আফগানিস্তান, ইরাক এবং পাকিস্তানে যুদ্ধ ছাড়াও ইরান, তুরস্ক এবং ইজরায়েল নিয়েও সমস্যা বেড়েই চলেছে। ১৯৮৯-তে রাশিয়ান ব্লকের পতনের পর একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের সঙ্গে কলহ সম্ভবতঃ সবচাইতে শঙ্কাজনক। অধিকৃত অঞ্চলে নতুন ক'রে ইহুদি বসতি না গড়ার জন্য আমেরিকার পরামর্শ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পর তথাকথিত 'গাজার জন্য সাহায্যসামগ্রী' বহনকারী ‘মাভি মামারা’ জাহাজে ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর আক্রমণ ও হত্যাকান্ডের ফলে আমেরিকা ইজরায়েলী সম্পর্কের মধ্যে আরও অবনতি ঘটেছে। প্রচলিত পদ্ধতি না মেনে আমেরিকান কূটনীতি এটা দেখাতে চেয়েছিল যে আমেরিকা 'ছয় জাহাজের ঐ কনভয়ের ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য' ইজরায়েলকে সতর্ক ক'রে দিয়েছিল (দি অবজার্ভার,০৭.০৬ ১০)। আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলা হয়েছিল " আমরা এব্যাপারে ইজরায়েলের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছি; আমরা সতর্কতা ও সংযত আচরণের ওপর জোর দিয়েছি।" আমেরিকান কূটনীতি এটা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল যে ছয় জাহাজের ঐ কনভয়টিতে আক্রমণ না করতে তারা ইজরায়েলের সঙ্গে বারেবারে যোগাযোগও করতে চেষ্টা করেছিল। তাদের কথায়, “ আমরা জাহাজটির ব্যাপারে ইজরায়েলের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছিলাম এবং তাদের সংযত ও সতর্ক হতে বলেছিলাম”। ইজরায়েলে আমেরিকার একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (৫ই জুন ২০১০ 'ওয়াসিংটন পোস্ট')'র মতে, “ইজরায়েল আমেরিকার এমন একটি মিত্র যে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে হাঁটছে”। এইভাবে তুরস্কও মনে হয় সাধারণভাবে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষক'রে বেশি বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা লাগামছাড়া সাম্রাজ্যবাদী হুটোপুটির ঐ এলাকায় আমেরিকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো সংহত করছে। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের তুরস্ক তার এলাকার মধ্যে যাতায়াত করতে না দিয়ে ইরান ও সিরিয়ার তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীনপথে চলার ক্ষমতা প্রদর্শণ করছে। প্যালেস্টাইনের প্রতি সহানুভূতিশীল দুনিয়ায় তুর্কি এখন একটা উঠতি শক্তিধর রাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের চেষ্টা ক'রে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে আর তাই আমেরিকান দাদাগিরি ও দালালির ফলে তৈরি তুর্কি-ইজরায়েল মিত্রতা সম্পর্কেরও সলিল সমাধি ঘটার সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে, বিশেষত:   মাভি মামারা জাহাজে কিছু তুর্কি নাগরিকের মৃত্যুর পর ব্যাপারটা তেমনই দেখাচ্ছে।   এছাড়াও রয়েছে আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চল ও আশেপাশের 'সঙ্কটাকীর্ণ' পরিস্থিতি। পৃথিবীর চরম উত্তপ্ত ও বিষ্ফোরক এলাকাগুলোর অন্যতম একটি হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। ইথিওপিয়ান মিলিটারি শক্তিকে চাঙ্গা ক'রে তোলার বৃটিশ-আমেরিকান সক্রিয়তা তাদেরই বিপদ বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে সমগ্র এলাকাটি অস্থির হয়ে রয়েছে আর আল কায়দা ও অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ইথিওপিয়া, ইরিট্রিয়া, সুদান ও সোমালিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো পুরোমাত্রায় এগুলোর সুযোগ নিয়ে নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরের অন্যদিকে ইয়েমেন আমেরিকার কাছে বেশি বেশি ক'রে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত হয়ে উঠছে।ইয়েমেনের ব্যাপারেআমেরিকা ও বৃটেনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটাকীর্ণ ক'রে তুলছে; এটাই হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্ম ও বেড়ে ওঠার উর্বরা জমি। এইসব গোষ্ঠী আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চল, উত্তর কেনিয়া, উপসাগরীয় এলাকা এবং সৌদি আরবেও সন্ত্রাসবাদী ক্রিয়াকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত এলাকার পরিস্থিতিএতটাই বিশৃঙখল হয়ে উঠেছে যে আমেরিকান বড়দার পক্ষেও তা নিয়ন্ত্রণ করা মুসকিল হয়ে পড়ছে।      এসব সমস্যা ছাড়াও আরও সমস্যা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি রণতরী উত্তর কোরিয়া সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবার ছোট ছোট শক্তিগুলিও আমেরিকান ধর্মবাপকে কোণঠাসা করতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। আমেরিকার 'সহযোগীরা'ও আর ততটা বিশ্বাসযোগ্য থাকতে পারবেনা কারণ তারাও তাদের নিজস্ব স্বার্থ নিয়েই মশগুল থাকবে। ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাতের এই পুরোপুরি অযৌক্তিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নানারকম ঘটনা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং আমেরিকার দুশ্চিন্তাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। একটা বিষয় নিশ্চিত যে আমেরিকা 'শান্তি ও সুসম্পর্ক স্থাপনের' বুলিব’লে এর মোকাবিলা করতে পারবেনা বা ওবামা যে মানবিকতার ভাবমূর্তি দেখাতে তৎপর তার মুখোশও খুলে যাবে। আমেরিকা পাশবিক সামরিক শক্তি ও যুদ্ধ দিয়েই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বাধ্য হবে আর পরিস্থিতিকে করে তুলবে আরো বিপজ্জনক; বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদীদ্বন্দ্ব সংঘাত ব্যাপকতর ও তীব্রতর হয়ে উঠবে। বেবুন(Baboon),০৯.০৬২০১০ ওয়ার্ল্ড রিভোল্যুশন, সংখ্যা ৩৩৫