ইন্টারন্যাশনাল কম্যুনিষ্ট কারেন্টের মৌলিক রাজনৈতিক অবস্থান

International Communist Current নিম্নলিখিত রাজনৈতিক অবস্থানগুলোর পক্ষে দাঁড়ায়:

  • প্রথম মহাযুদ্ধের সময় থেকে পুঁজিবাদ একটি পতনশীল সামাজিক ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।দু’দুবার এই পতনশীল পুঁজিবাদ সঙ্কট, বিশ্বযুদ্ধ, পুনগর্ঠন এবং পুনঃসংকটের ববরর্তার আবর্তে নিমজ্জিত করেছে/ঘুরপাক খাইয়েছে মানবসমাজকে। ১৯৮০-র দশকে পুঁজিবাদ প্রবেশ করেছে পতনশীলতার চূড়ান্ত অবস্থা অথাৎ পতনশীলতার পযার্য়ে।এই অপরিবতর্নীয় (irreversible) ঐতিহাসিক পতনশীলতার একটিই বিকল্প ইতিহাস আজ হাজির করেছে: সমাজতন্ত্র অথবা ববরর্তা, বিশ্ব কম্যুনিষ্ট বিপ্লব অথবা মানব প্রজাতির ধ্বংস।
  • ১৮৭১ সালে প্যারিস কমিউন ছিল এই বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রথম প্রলেতারিয় প্রচেষ্টা। তবে এই বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত শরতাবলী তখনো পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি; একমাত্র পুঁজিবাদের পতনশীলতার যুগে এইসব শর্ত্ত পরিপক্ক হয়ে উঠল আর তারই ফলস্বরূপ বিশ্ব কমিউনিষ্ট বিপ্লবের লক্ষ্যাভিমুখী আন্তজার্তিক শ্রমিক বিপ্লবী সংগ্রামের শীষবিন্দু হয়ে উঠল ১৯১৭’র রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব; বিপ্লবী সংগ্রামের এই তরঙ্গপ্রবাহ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটাল এবং বেশ কয়েক বছর ধ’রে তার জোয়ার চলতে লাগল। এই বিপ্লবী তরঙ্গের পরাজয়(বিশেষ ক’রে ১৯১৯-২৩ সালে জামার্নীতে বিপ্লবী সংগ্রামের পরাজয়)-এর ফলে রাশিয়ার বিপ্লব বিচ্ছিন্নতা ও দ্রুত অধঃপতনের শিকার হল। স্ট্যালিনিজম্ রাশিয়ার বিপ্লবের ফল নয় বরং সম্পূর্ণবিপরীত: এ হল রুশ বিপ্লবের কবরখননকারী।
  • USSR(সোভিয়েত ইউনিয়ন), পূরব ইউরোপ, চীন, কিউবা ইত্যাদি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রনাধীন দেশগুলো যাদেরকে বলা হত ‘সোস্যালিস্ট’ বা ‘কম্যুনিস্ট’ দেশ সেগুলো আসলে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সাবর্জনীন প্রবনতারই বিশেষ এক জঘন্যরূপ ছাড়া কিছুই নয়। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ পুঁজির পতনশীলতার যুগের(period of decadence) একটা অন্যতম প্রধান এবং সাবর্জনীন বৈশিষ্টমাত্র।
  • বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সমস্ত যুদ্ধই হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। সারা দুনিয়া জুড়ে ছোট বড় প্রতিটি রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা দখল বা দখলে রাখার মরীয়া লড়াইগুলো এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধেরই অংশমাত্র। সমগ্র মানব সভ্যতাকে ক্রমাগত বেশি মাত্রায় মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়া এইসব যুদ্ধের আর কিছু দেবার নেই। কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক শ্রেণি-সংহতি এবং প্রতিটি দেশের বুজোর্য়াদের বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে দিয়েই শ্রমিক শ্রেণি এসবের যথোপযুক্ত মোকাবিলা করতে পারে।
  • জাতিসত্তাগত(ethnic), ঐতিহাসিক বা ধমীর্য় যে অজুহাতই হোক না কেন, ‘জাতীয় স্বাধীনতা’, ‘জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার’ ইত্যাদি যে কোনও জাতীয়তাবাদী মতাদরশই শ্রমিক-শ্রেণির কাছে প্রকৃত অরথে বিষ ছাড়া আর কিছুই নয়। বুজোর্য়াদের কোন এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষকে সমথর্ন করতে আহ্বান জানায় এইসব মতাদরশ এবং তার ভেতর দিয়ে শ্রমিকদের বিভাজিতই শুধু করে না, শোষকদের যুদ্ধে ও স্বারথে তাদের পরস্পরকে ধ্বংস করার পথে পরিচালিত করে।
  • পুঁজির পতনশীলতার যুগে পারলিয়ামেন্ট ও নিবার্চন মুখোস ছাড়া আর কিছু নয়। সংসদীয় সাকার্সে অংশগ্রহনের যে কোন আহ্বান এই মিথ্যাটাকেই জোরদার করে যে শোষিত মানুষের কাছে নিবার্চনী ব্যবস্থায় অংশ নেওয়াটাই একমাত্র সঠিক বিকল্প। ‘গনতন্ত্র’ অরথাৎ বুজোর্য়াদের আধিপত্যের এক বিশেষ ভন্ডামিভরা রূপ, আসলে, স্ট্যালিনিজম্ এবং ফ্যাসিজিম্-এর মতো পুঁজিবাদী একনায়কতন্ত্রের অন্যান্য রূপের থেকে আলাদা কিছু নয়।
  • বুজোর্য়াদের যে কোনও অংশ(Fraction)-ই একইরকম প্রতিক্রিয়াশীল। সব রকমের তথাকথিত ‘ওয়াকার্স’(‘workers’),‘সোস্যালিস্ট’(‘socialist’) এবং কম্যুনিষ্ট পার্টি(বতর্মানে Ex-‘Communists’),বামপন্থী সংগঠন(যথা: ট্রটস্কিপন্থী[Trotskyists],মাওপন্থী[Maoists] এবং প্রাক্তন-মাওপন্থী[Ex-Maoists], সরকারি নৈরাজ্যবাদী[Official Anarchists]) সকলে মিলে পুঁজিবাদের রাজনৈতিক যন্ত্রের বাম অংশ গড়ে তুলেছে। পপুলার ফ্রন্ট(Popular Front), অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফ্রন্ট(Anti-Fascist Front) এবং ইউনাইটেড ফ্রন্ট(United Front) বা সংযুক্ত মোরচার রণকৌশল প্রলেতারিয়েতের স্বারথের সঙ্গে বুজোর্য়াদের কোন না কোন অংশের স্বারথকে গুলিয়ে দেয় আর এভাবে তা প্রলেতারিয়েতের সংগ্রামকে শ্বাসরুদ্ধ ও বিপথগামী করার কাজই ক’রে থাকে।
  • পুঁজির পতনশীলতার সাথে সাথে (ট্রেড) ইউনিয়নগুলো সবর্ত্রই প্রলেতারিয়েতের ভিতরে পুঁজির স্বারথ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত (Official) বা অপ্রতিষ্ঠিত(Rank and file)যে ধরণেরই হোক, ইউনিয়ন শ্রমিকশ্রেণিকে পুঁজিবাদের চৌহদ্দির ভেতর শৃংখলা-পরায়ণ রাখতে এবং শ্রেণি-সংগ্রামে অন্তর্ঘাতকারী হিসেবেই কাজ ক’রে থাকে।
  • লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সাবর্ভৌম সাধারণ সভা(sovereign General Assemblies) ও তাতে নিবার্চিত এবং যে কোন সময় প্রত্যাহারযোগ্য প্রতিনিধি(delegate) কমিটির মাধ্যমে সংগ্রামগুলোর বিস্তৃতি ও সংগঠনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েই শ্রমিকশ্রেণিকে তার সংগ্রামগুলো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
  • সন্ত্রাসবাদ কোনওভাবেই শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামের পন্থা নয়। সন্ত্রাসবাদ হচ্ছে ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎহীন সামাজিক স্তর ও পেটি-বুজোর্য়াদের পচনশীলতার একটা প্রতিফলন যদি তা বুজোর্য়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার স্থায়ী যুদ্ধের প্রকাশ না হয়ে থাকে। সন্ত্রাসবাদ সব সময়ই বুজোর্য়া অভিসন্ধি চরিতারথ করার উরবর জমি হয়ে থেকেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর গোপন ক্রিয়াকলাপের প্রবক্তারূপে সন্ত্রাসবাদ শ্রেণি-হিংসার(Class-Violence) সম্পূরণো বিপরীত: সমগ্র প্রলেতারিয়েতের সচেতন ও সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ সক্রিয়তা(mass action)থেকেই এই শ্রেণিহিংসা উৎসারিত।
  • একমাত্র শ্রমিক-শ্রেণিই কম্যুনিষ্ট বিপ্লব সম্পন্ন করতে সক্ষম।এই বিপ্লবী সংগ্রাম আনিবারযভাবে শ্রমিকশ্রেণিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘরষের দিকে নিয়ে যাবে।পুঁজিবাদকে ধ্বংস করতে হ’লে শ্রমিকশ্রেণিকে বতর্মান সমস্ত রাষ্ট্রকে উৎখাত করতে হবেএবং সারা দুনিয়া জুড়ে প্রলেতরিয়েতের একনায়কত্ব অরথাৎ ওয়াকারর্স কাউন্সিল গুলোর(Workers’ Councils) আন্তর্জাতিক ক্ষমতা। বিশ্বব্যাপী প্রলেতরিয়েতকে সংঘবদ্ধ ক’রেই এটা করতে হবে।
  • Workers’ Councilগুলো দ্বারা সমাজের সাম্যবাদী(communist) রূপান্তরের অরথ স্ব-নিয়ন্ত্রন(self-management) বা অথর্নীতির জাতীয়করণ(nationalisation)নয়--- কমিউনিজমের জন্য দরকার পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পরকের অরথাৎ মজুরি শ্রম, পণ্য উৎপাদন, রাষ্ট্টীয় সীমানার অবসান। শ্রমিকশ্রেণিকে এই সবেরই অবসান ঘটাতে হবে। এর অরথ হল এমন এক বিশ্বমানবসমুদায়ের (world community) সৃষ্টি যেখানে সমস্ত কমর্কান্ডের লক্ষ্য হবে মানুষের যাবতীয় প্রয়োজন সম্পূরণোরূপে মেটানো।
  • বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী এবং তা প্রলেতারিয়েতের সমস্ত অংশের মধ্যে শ্রেণি-সচেতনতা বিকাশের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ‘শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করা’ বা শ্রমিকশ্রেণির নামে ‘ক্ষমতা দখল করা’তার কাজ নয়। শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামগুলোর একসূত্রে গ্রথিত হওয়া এবং সেগুলোর ওপর শ্রমিকশ্রেণির নিজেরই নিয়ন্ত্রণ বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করাই বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ। একইসঙ্গে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি সংগ্রামের বিপ্লবী রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে শ্রমিকশ্রেণির কাছে সুনিদির্ষ্টভাবে তুলে ধরাটাও তার কাজ।

OUR ACTIVITY (আমাদের ক্রিয়াকলাপ):

  • প্রলেতারিয়েতের সংগ্রামের লক্ষ্য, পদ্ধতি, সে সংগ্রামের ঐতিহাসিক ও তাৎক্ষণিক অবস্থা সম্বন্ধে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক স্বচ্ছতা(clarification) অজর্ন।
  • প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী কমর্কান্ড বিকাশের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহায়ক উপাদান হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে ঐক্যবদ্ধ, কেন্দ্রীয় পরিচালনাধীন(centralised), সংগঠিত, সবার্ত্মক অংশগ্রহণ(intervention)।
  • সত্যিকারের একটি World Communist Party সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে বিপ্লবীদের সংঘবদ্ধ করা। পুঁজিবাদের উৎখাত এবং কম্যুনিষ্ট সমাজের সৃষ্টির জন্য শ্রমিকশ্রেণির কাছে World Communist Party অপরিহারয।

OUR ORIGINS (মাদের উৎস):

বিপ্লবী সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান ও ক্রিয়াকলাপ হল শ্রমিকশ্রেণির অতীতের অভিজ্ঞতা ও সমগ্র ইতিহাস জুড়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যেসব শিক্ষা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে সে সবেরই ফসল। মাকর্স এবং এঙ্গেলসের কম্যুনিষ্ট লিগ (১৮৪৭-১৮৫২), তিনটি আন্তর্জাতিক (ইন্টারন্যাশনাল ওয়ারর্কিং মেনস্ অ্যাসোসিয়েসন্ ১৮৬৪-১৮৭২, দ্য সোস্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৮৮৯-১৯১৪, দ্য কম্যুনিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৯১৯-১৯২৮), তৃতীয় আন্তর্জাতিক থেকে বেরিয়ে আসা লেফ্ট ফ্রাকসন(left Fractions) বিশেষ ক’রে জামার্ন, ডাচ এবং ইতালিয়ান লেফ্ট-এর ধারাবাহিক অবদানের মধ্যে ICC তাই নিজের উৎস খুঁজে পেয়েছে।