The Decadence of Capitalism

শুধুমাত্র একটা আশা বা বিমূর্ত ঐতিহাসিক সম্ভাবনা বা পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে না থেকে একটা মূর্ত বাস্তব কমর্কান্ডে রূপলাভের জন্য  প্রলেতারীয় বিপ্লবকে মানব সমাজের বিকাশের লক্ষ্যে বস্তুগতভাবে  প্রয়োজনীয়  হয়ে উঠতে হত; প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে মানব সমাজের মধ্যে  বস্তুগত পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নিয়েছে।

এই যুদ্ধ সূচিত করেছে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার উথ্থানের যুগের(ascendant phase) অবসান। পুঁজিবাদের  উথ্থানের যুগের শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে এবং  ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে তা পৌঁছে যায় উথ্থানের সর্বোচ্চ শিখরে।   তারপর থেকে যে নতুন এক পযার্য়ে পুঁজিবাদ প্রবেশ করে  তা হল পুঁজিবাদের অবক্ষয়ের যুগপূববর্তী সমস্ত সমাজব্যবস্থার মতোই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাও তার  প্রথমপযার্য়ে  উৎপাদন সম্পর্কের ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজনীয় চরিত্রের অর্থাৎ সমাজের উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অপরিহারয ভূমিকারই অভিব্যক্তি হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় পযার্য়ে কিন্তু এই সর্ম্পকগুলো উৎপাদিকা শক্তির অব্যাহত বিকাশের পথে ক্রমাগত বেশিবেশি করে বাধা ও শৃঙ্খলে পরিণত হতে থাকল।উৎপাদন সর্ম্পকের সহজাত অর্ন্তনিহিত দ্বন্দ্বগুলোর বিকাশের মধ্যেই পুঁজিবাদের অবক্ষয়ের জন্ম। নিম্নলিখিতভাবে এর সারসংক্ষেপ করা যায় :পণ্যের অস্তিত্ব যদিও প্রায়সমস্ত পূবর্তন সমাজব্যবস্থাতেই ছিল কিন্ত পুঁজিবাদী অর্থনীতিই হচ্ছে প্রথম অর্থনীতি যার মূল ভিত্তিই হল পন্য উৎপাদন। তাই পুঁজিবাদ বিকাশের অত্যাবশ্যক শর্তগুলোর অন্যতম একটা হল ক্রমবর্ধমান বাজারের অস্তিত্ব । বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণীর শোষন থেকে উদ্ভূত উদ্বৃত্ত মূল্যের উপলব্ধি (realization) পুঁজি সঞ্চয়ের জন্য অপরিহায । এটাই হল এই ব্যবস্থার অত্যাবশ্যক চালিকাশক্তি। বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বাজার পুঁজিবাদীউৎপাদন আপনা-আপনি   এবং খুশিমত সৃষ্টি করতে পারে না । পুঁজিবাদের স্তাবক ও উপাসকদের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীতে এটা ঘটে থাকে । প্রাক্ পুঁজিবাদী(Non-capitalist) দুনিয়ার গর্ভেই পুঁজিবাদের জন্ম আর এই দুনিয়াতেই সে খুঁজে পেয়েছিল বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বাজার কিন্তু সারা দুনিয়া জুড়ে উৎপাদন সম্পর্কের বিস্তার ঘটিয়ে এবং বিশ্ববাজারকে একসূত্রে বেঁধে পুঁজিবাদ এমন এক অবস্থায় পৌঁছল যে ঊনবিংশ শতাব্দীর অব্যাহত বৃদ্ধির সহায়ক বাজার সম্পৃক্ত হয়ে উঠল। উপরন্তু, উদ্বৃত্ত মূল্যের উপলব্ধির জন্য বাজার খুঁজে পাওয়ার ক্রমবর্ধমান অসুবিধা লাভের হার কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে জোরদার করে তোলে । উৎপাদনের উপকরণের মূল্য এবং তাকে ক্রিয়াশীলকরার জন্য নিযুক্ত শ্রমশক্তির মুল্যের অনুপাত ক্রমাগত বেড়ে চলে আর তাই লাভের হার কমে যেতে থাকে। এখন এটা শুধুমাত্র প্রবণতা না হয়ে বেশি বেশি করে বাস্তব ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে । পুঁজি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া এবং ফলে গোটা ব্যবস্থার গতিশীলতার  পক্ষেই এটা যেন এখন গোদের ওপর বিষফোঁড়া । পণ্য বিনিময়কে একসূত্রে গ্রথিত ও বিশ্বজনীন করে তুলে আর তাই অগ্রগতির পথে মানবসমাজের বিরাট উল্লম্ফন ঘটানোর ফলে পুঁজিবাদ আজ পণ্য বিনিময়ের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা উৎপাদন সম্পর্কের অবলুপ্তির বিষয়টিকে (ঐতিহাসিক) কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে তুলেছে । কিন্তু শ্রমিকশ্রেণী যতদিন পযন্ত না অবলুপ্তির এই কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করে তুলছে,এই সম্পর্কগুলো থেকেই যায় এবং মানবসমাজকে একের পর এক বেশি বেশি অর্ন্তদ্বন্দ্বে জর্জরিত করে তোলে ।পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অর্ন্তনিহিত দ্বন্দ্বগুলোর বৈশিষ্ট্যসূচক অভিব্যক্তি হল অতি উৎপাদন।

অতীতে ব্যবস্থাটা সুস্থ, সবল থাকার সময়ে,বাজার সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে এটা  অনুপ্রেরণাই  যোগাত।   আর এটাই এখন পরিণত হয়েছে স্থায়ী সঙ্কটে ।পুঁজির উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা পুঁজিবাদ আর কাজে লাগাতে পারে না,একটা কম অংশকে মাত্র কাজে লাগানোটাই   স্থায়ী চরিত্র অর্জন করেছে । শুধুমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল রেখেই সামাজিক আধিপত্যের বিস্তার ঘটাতে অসমর্থ হয়ে পড়েছে  পুঁজিবাদ । পুঁজিবাদ আজ সারা দুনিয়া জুড়ে চরম দুঃখ ও দারিদ্রেরই বিস্তার ঘটাতেই শুধু সক্ষম। অনেক পিছিয়ে পড়া দেশে ইতিমধ্যেই এটা মারা দেখেছি।এই অবস্থায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতা ও বিরোধ বেশি বেশি করে অদম্য তীব্রতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯১৪ সাল থেকে ছোট,বড় প্রতিটি রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার উপায় হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদ আর তা সমস্ত মানবসমাজকে নিক্ষেপ করেছে সংকট-যুদ্ধ-পুর্নগঠন-নতুন সংকট ......এই নারকীয় চক্রের ভয়ংকর আবর্তে। প্রচুর পরিমানে মারণাস্ত্রের উৎপাদন হলএই চক্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।পুঁজিবাদের কাছে ক্রমাগত বেশি করে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের এবং উৎপাদিকা শক্তির পূর্ণমাত্রায়   ব্যবহারের একমাত্র ক্ষেত্র এখন এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে । পুঁজিবাদের এই অবক্ষয়ের যুগে আত্মহনন (Self-mutilation) ও ধ্বংসসাধনের স্থায়ী বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে বাস করাটাই হয়ে উঠেছে মানবসমাজের নিয়তি।দারিদ্রের যে মূর্ত,নগ্ন রূপ অপেক্ষাকৃত কম বিকশিত দেশ গুলোকে পিষে পিষে নাজেহাল করে তুলছে, বেশি বিকশিত দেশ গুলোতে সামাজিকসম্পর্কের অভূতপূর্ব অমানবিক অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হচ্ছে তারই প্রতিধ্বনি । বেশি বেশি করে ভয়ানক,ঘাতকযুদ্ধ এবং সুব্যবস্থিত,সুপরিকল্পিত,বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শোযণ ছাড়া আর অন্য কোন ভবিষ্যতের দিকে মানবসমাজকে নিয়ে যেতে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত অপারগতার এটাই  হল  পরিণতি। ফলে অন্যান্য পতনশীল সমাজব্যবস্থার মতোই,সামাজিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাদী মতাদর্শ,নৈতিক মূল্য ,শিল্পকলার রূপ এবং পুঁজিবাদের অন্যসব সাংস্কৃতিক রূপের    পচনশীলতা ক্রমেই  বেড়ে চলেছে । বিপ্লবী বিকল্পের   অবতর্মানে ফ্যাসিবাদ ও স্তালিনবাদের মত মতাদর্শের বিকাশ   দানবীয় ববরর্তার বিজয়েরই অভিব্যক্তি।