a. বিপ্লবীদের সংগঠন শ্রেণী সচেতনতা এবং সংগঠন (class consciousness and organization)

সচেতন এবং সংগঠিতরূপেই কেবল প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত যে কোন শ্রেণি কারযকর ভাবে সংগ্রাম চালাতে পারে । কোন নতুন সমাজব্যস্থার ধারক ও বাহক না হওয়া সত্ত্বেও ক্রীতদাস ও কৃষকদের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই এটা ঘটেছিল, সংগঠনের রূপ ও সচেতনতায় যতই অপূর্ণতা এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ (alienation) থাকুন না কেন । কিন্তু সমাজের বিবর্তনের ফলে যে উৎপাদন সম্পর্ক অপরিহারয হয়ে ওঠে তার ধারক ও বাহক ঐতিহাসিক শ্রেণী গুলোর ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি করে প্রযোজ্য ।এইসব ঐতিহাসিক শ্রেণির মধ্যে প্রলেতারিয়েতই হচ্ছে একমাত্র শ্রেণি , পুরনো সমাজের মধ্যে যে কোনরকম অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারি নয় বা হতে পারেনা । এইজন্যই  প্রলেতারিয়েতের শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে সংগঠন এবং সচেতনতার  ভূমিকা আরো অনেক বেশি নির্ণায়ক (decisive) । 

বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য শ্রমিকশ্রেণী worker's council- এর মত সংগঠনই সৃষ্টি করে । শ্রমিকশ্রেণীর সমস্ত সদস্যের সচেতন সক্রিয়তারই ফসল হল বিপ্লব  এবং বিপ্লবের মুহূর্তে সকলেই তারা এিসব সংগঠনের মধ্যে একতাবদ্ধ হয় । কিন্তু শ্রেণীর সচেতন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা কোনভাবেই যুগপৎ (simultaneous) বা সমরূপ (homogeneous) নয় । শ্রেণী সংগ্রাম সাফল্য ও ব্যর্থতার অনেক আঁকাবাঁকা ঘুরপথের ভিতর দিয়েই বিকাশলাভ করে শ্রেণি সচেতনতা । শ্রমিকশ্রেণীকে বিভাগীয় (sectional) এবং জাতীয় (national)সমস্ত বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে । পুঁজিবাদী সমাজে এইসব বিভাজন খুবই ‘স্বাভাবিক' আর শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে এই বিভাজন গুলোকে স্থায়ী করে তোলার মধ্যেই আছে পুঁজিবাদের যাবতীয় স্বার্থ ।

b.বিপ্লবীদের ভূমিকা   (The role of revolutionaries)

সচেতন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া অসমরূপ(heterogeneous) হওয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর একটা অংশ অন্যদের থেকে আগে ‘প্রলেতারীয় আন্দোলনের এগিয়ে চলার পথ ,সামগ্রিক অবস্থা এবং সাধারণ চূড়ান্ত পরিণতি' (Communist Manifesto) সম্বন্ধে সুস্পষ্ট সচেতনতা অর্জন করেন । বিপ্লবীরা হচ্ছেন সচেতনতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা শ্রমিকশ্রেণীর এই অংশেরই সদস্য । পুঁজিবাদী সমাজে ‘শাসকশ্রেণীর ধারণাগুলোরই প্রাধান্য বজায় থাকে' , আর তাই বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত শ্রমিকশ্রেণির অংশটা অবশ্যম্ভাবীরূপে সংখ্যালঘুই হয়ে থাকে । 

 শ্রেণীর ভিতর থেকে উদ্ভূত এবং সচেতন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার বাস্তব প্রতিফলন হিসাবে , এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভুমিকা পালন করেই কেবল , বিপ্লবী সত্তা বজায় রাখতে পারেন বিপ্লবীরা ।অলঙ্ঘনীয়ভাবে এই কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্য বিপ্লবী সংগঠন :

  • শ্রমিকশ্রেণীর সমস্ত সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে এবং সবথেকে দৃঢ়চেতা এবং সচেতন লড়াকু যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের স্বাতন্ত্র প্রতিপন্ন করেন বিপ্লবীরা ।
  • এই সব সংগ্রামের মধ্যে থেকে শ্রমিকশ্রেণীর সমস্ত অংশের সাধারণ স্বার্থ (general interests) এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যের গুরুত্বকে সব সময় সক্রিয় ভাবে তুলে ধরে ।
  • সমস্ত শ্রেণীর সচেতনতা বিকাশের প্রক্রিয়ায় এই সক্রিয় অংশগ্রহণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হীসেবে আরো বেশি তাত্ত্বিক স্বচ্ছতা ও গভীরতা অর্জন এবং বিচার বিশ্লেষণের কাজে সম্পূর্ণ আন্তরিকতাসহ স্থায়ী ভাবে আত্মনিয়োগ করে । এইভাবেই কেবল শ্রেণীর সমস্ত অতীত অভিজ্ঞতা এবং এই তাত্ত্বিক কাজের দ্বারা নির্ধারিত সংগ্রামের ভবিষ্যৎ রূপরেখার উপর ভিত্তি করে , সাধারণ ক্রিয়াকলাপ সঞ্চারিত করা সম্ভব হবে । বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনের সবথেকে বিকশিত রূপ হল পার্টি । ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সচেতনতার বিকাশ , সেই ভবিষ্যতের লক্ষ্যে সংগ্রাম গুলির রাজনেতিক দিশা নির্ধারণের প্রয়োজনীয় অঙ্গ হিসেবে শ্রমিকশ্রেণী সৃষ্টি করেছে এই বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন । এইজন্যই পার্টির অস্তিত্ব ও ক্রিয়াকলাপ শ্রমিকশ্রেণির চুড়ান্ত বিজয়ের অপরিহারয পূর্বশর্ত হয়ে ওঠে ।

c. শ্রমিকশ্রেণী এবং বিপ্লবীদের সংগঠনের মধ্যেকার সম্পর্ক (The relationship between the class and the organization of the revolutionaries)   

শ্রমিকশ্রেণীর সাধারণ সংগঠন (general organization) এবং বিপ্লবীদের সংগঠন একই আন্দোলনের অংশ , কিন্তু দুইয়ের মধ্যেকার পার্থক্য বেশ স্পষ্ট (distinct)।

প্রথমটি অর্থাৎ কাউন্সিলগুলো (councils) গোটা শ্রেণীটাকে ঐক্যবদ্ধ করে । শ্রমিকমাত্রই এগুলোর অন্তভুর্ক্ত হতে পারেন ।

পক্ষান্তরে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ বিপ্লবী সংগঠন শ্রেণীর বিপ্লবী সদস্যগণকেই কেবল জোটবদ্ধ বা ঐক্যবদ্ধ করে । সদস্যতার মাপকাঠি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ;সমাজবিদ্যাগত(sociological) মাপকাঠি  আর কোনমতেই খাটেনা অর্থাৎ শ্রমিক হলেই শুধু সদস্য হওয়া যায় না । কর্মসূচির সমর্থন ও স্বপক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারবদ্ধতাই হচ্ছে সদস্যতার মাপকাঠি । এই কারণেই সমাজবিদ্যাগত ভাবে শ্রমিকশ্রেণীর অংশ নন এমন ব্যক্তিরাও শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনীর (vanguard) অন্তভুর্ক্ত হতে পারেন । এইসব ব্যক্তি নিজেদের শ্রেণীর সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে প্রলেতারিয়েতের ঐতিহাসিক শ্রেণী স্বার্থের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন ।

অগ্রগামী বাহিনীর সংগঠন এবং সমগ্র শ্রমিকশ্রেণী পরস্পরের থেকে সুস্পষ্ট রূপে পৃথক হওয়া সত্ত্বেও তারা কখনোই পরস্পর বিচ্ছিন্ন , বহিরাগত বা বিরোধী নয়  যদিও একদিকে ‘Leninist' ও অন্যদিকে ‘ouvrierist-councilist' ধারার প্রবক্তারা সম্পূর্ণ বিপরীতটাই দাবী করে থাকেন । পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা , সমগ্র ও সমগ্রের অংশ হিসেবে শপমিকশ্রেণি ও বিপ্লবীরা পরস্পরের প্রকৃত পরিপূরক । ওই উভয় ধরনের প্রবক্তারাই অস্বীকার করেন এই সত্যকে । কমিউনিষ্টদের কাছে ‘প্রলেতারিয়েতের সমস্ত অংশের সাধারণ স্বার্থ ছাড়া অন্য কোন আলাদা স্বার্থ নেই' (Communist Manifesto) বলে , অগ্রগামী বাহিনী ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কোনোরকম বলপ্রয়োগের সম্পর্ক কখনোই থাকতে পারে না ।

শ্রেণীর একটা অংশ হিসেবে বিপ্লবীরা কখনোই সমগ্র শ্রেণীর বদলে নিজেদেরকে প্রতিস্থাপিত(substitute) করতে পারে না । পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে সংগ্রামের ক্ষেত্রে এটা যেমন প্রযোজ্য , পুঁজিবাদের উৎখাৎ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখার ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি করে প্রযোজ্য । সংখ্যালঘু অংশের সচেতনতা যতই বিকশিত ও উন্নত হোক না কেন , প্রলেতারিয়েতের কর্তব্যগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয় । অন্যান্য ঐতিহাসিক শ্রেণীর ক্ষেত্রে কিম্তু এমনটা ছিলনা । সৃজনধর্মী ক্রিয়াকলাপ ও অন্যান্য যাবতীয় কাজকর্মে সমগ্র শ্রেণির সমস্ত সদস্যের সব সময় সক্রিয় অংশগ্রহণ , এইসব কর্তব্য সম্পাদনের জন্য অপরিহারয ।

সমগ্র শ্রেণী ব্যাপী শ্রেণী সচেতনতার বিকাশ(generalized consciousness) ই হচ্ছে প্রলেতারীয় বিপ্লবের একমাত্র গ্যারান্টি আর এটা আসলে বাস্তব অভিজ্ঞতারই ফল হওয়ায় , বিপ্লবের যাবতীয় ক্রিয়াকলাপে শ্রেণীর সব অংশেরই সক্রিয় অংশগ্রহণের কোনো ও বিকল্প নেই । বিশেষ করে , প্রয়োজনে হিংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের সাহায্য নেওয়ার বিষয়টিকে শ্রেণীর সাধারণ সংগ্রাম (general movement) বা আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না । এইজন্যই ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগত উদ্যোগে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব পদ্ধতির কোনরকম সম্পর্ক বা সাদৃশ্য নেই । বুজোর্য়া গোষ্ঠীগুলোর (fractions) মধ্যেকার কুৎসিৎ নগ্ন রেষারেষি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের স্পষ্ট অভিব্যক্তি না হয়ে থাকলে , এটা বড়জোর পেটি বুজোর্য়া অধৈয ও হতাশার প্রকাশমাত্রই হতে পারে । শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের মধ্যেই এর আবির্ভাব , শ্রেণীর বাইরেকার অর্থাৎ বুজোর্য়া বা পেটি বুজোর্য়া প্রভাবগুলোকেই সূচিত করে এবং শ্রেণী সচেতনতা বিকাশের ভিত্তিকেই কেবল দুর্বল করে থাকে ।

শ্রমিক সংগ্রামের স্ব - সংগঠন (self-organization) এবং শ্রেণির সমস্ত অংশের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ কমিউনিজমে পৌঁছনোর অনেক পরস্পর তুলনীয় রাস্তার মধ্যে একটামাত্র রাস্তা শুধু নয় , এটা হল একমাত্র রাস্তা

d. শ্রমিকশ্রেণীর স্বাতন্ত্র‌ (The autonomy of the working class  )

প্রতিস্থাপনার চিন্তাভাবনার (Substitutionist conception) বিপরীতে ouvrierist(ওয়ার্কারিস্ট) এবং anarchist(নৈরাজ্যবাদী) ধারার প্রবক্তারা ‘শ্রেণী স্বাতন্ত্রের' (class autonomy) যে ধারণা ব্যবহার করে থাকে , তার তাৎপরয সম্পূর্ণরূপে প্রতিক্রিয়াশীল ও পেটিবুজোর্য়া। এদের এই ‘স্বাতন্ত্র' (autonomy) প্রায়ই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের ‘স্বাতন্ত্রের' ই নামান্তর মাত্র হয়ে থাকে । প্রতিস্থাপনার প্রবক্তাদের ঘোরতর বিরোধিতা করেও , তাদের মতোই শ্রমিকশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করার দাবী করে এরা । এসব ছাড়াও এদের এই ধারণার দুটো প্রধান দিক বা তাৎপরয আছে :

  • শ্রমিকদের দ্বারা যে কোন ধরনের রাজনৈতিক পার্টি বা সংগঠনের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ।
  • অন্যান্য অংশের সঙ্গে সম্পর্কের পরিপ্রক্ষিতে শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিটি অংশের (কারখানা , পারিপার্শ্বিক এলাকা ,অঞ্চল , জাতিরাষ্ট্র ইত্যাদি ) স্বাতন্ত্র যার অর্থ হল federalism বা বিকেন্দ্রীবূত অবস্থা ।

আজকের দিনে এইসব ধারণা সবথেকে ভালো হলে , বড় জোর Stalinist আমলাতন্ত্র এবং সবর্শক্তিমান,সর্বগ্রাসী শাসনতন্ত্র বা রাষ্ট্রযন্ত্র বিকাশের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ধরণের প্রতিক্রিয়ামাত্র হতে পারে আর সবথেকে খারাপ হলে , পেটি বুজোর্য়াদের বৈশিষ্ট্যসূচক বিচ্ছিন্নতাবোধ বা বিভাজিত অবস্থার রাজনেতিক অভিব্যক্তিই হয়ে থাকে । কিন্তু এই দুটোই প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী সংগ্রামের তিনটি মৌলিক দিক বা তাৎপরযের উপলব্ধির সম্পূর্ণ অভাবকেই সূচিত করে :

  • শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্তব্যগুলোর (বুজোর্য়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধ্বংসসাধন ,প্রলেতারিয়েতের বিশ্বব্যাপী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা ) গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার ।
  • শ্রেণীর ভিতর বিপ্লবীদের সংগঠনের গুরুত্ব এবং অপরিআরযতা ।
  • শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামের ঐক্যমূলক (Unitary) , কেন্দ্রীভূত(centralized) এবং বিশ্বব্যাপী চরিত্র ।

মার্কসবাদী হিসেবে , আমাদের কাছে শ্রেণী স্বাতন্ত্রের অর্থ হল সমাজের অন্যান্য শ্রেণী থেকে শ্রমিকশ্রেণীর স্বতন্ত্রতা বা স্বাধীনতা (independence) । আজকের দিনে প্রলেতারিয়েতইেকমাত্র বিপ্লবী শ্রেণী হওয়ায় , বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপের জন্য এই স্বাতন্ত্র অপরিহারয পূবর্শর্ত INDISPENSABLE PRECONDITION হয়ে উঠেছে । সাংগঠনিক (কাউন্সিলগুলোর সংগঠন, The organization of the councils)এবং রাজনৈতিক উভয়স্তরেই এই স্বতন্ত্রতার অভিব্যক্তি ঘটে আর প্রলেতারিয়েতের কমিউনিষ্ট অগ্রগামী বাহিনী বা vanguardএর সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কের ভিত্তিতেই এটা ঘটে । ouvrierist ধারার প্রবক্তাদের ঘোষণার তাই এটা বিপরীত।

e.শ্রেণী সংগ্রামের বিভিন্ন মুহূর্তে বিপ্লবীদের সংগঠন (The organization of revolutionaries in the different moments of the class struggle) 

কাজকর্মের বিচারের ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠন(general organization) এবং বিপ্লবীদের সংগঠন যেমন পরস্পর পৃথক তেমনি তাদের উদ্ভবের পরিস্থিতিও পৃথক । পুঁজিবাদী পুরো ব্যবস্থাটারই বিরুদ্ধে বিপ্লবী চ্যালেঞ্জের সময়ই কেবল   কাউন্সিলগুলোর (worker's council) আবির্ভাব ঘটে যখন শ্রেণীর সমস্ত সংগ্রামই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যাভিমুখে চালিত হয় । কিন্তু শ্রেণী সচেতনতা বিকাশের জন্য শ্রেণীর সক্রিয় প্রচেষ্টার কোনও বিরাম নেই , জন্মলগ্ন থেকেই চলছে সেই প্রচেষ্টা আর চলতেও থাকবে যতক্ষণ না কমিউনিষ্ট সমাজের মধ্যে পৃথক একটা শ্রেণী হিসেবে অবলুপ্তি ঘটেছে তার । এই বিরামহীন প্রচেষ্টার মূর্ত প্রকাশ হিসেবে কমিউনিষ্ট সংখ্যালঘু অংশের অস্তিত্ব সবসময়ই তাই থেকে গেছে শ্রেণীর মধ্যে । কিন্তু এই সংখ্যালঘু অংশের উদ্দেশ্য , প্রভাব , ক্রিয়াকলাপের পরিধি , পদ্ধতি , নীতি এবং সংগঠনের ধরনধারন ইত্যাদি সবকিছুই শ্রেণীসংগ্রামের সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ। 

শ্রেণীর সংগ্রামী ক্রিয়াকলাপ তীব্র রূপ ধারন করার পরযায়ে , ঘটনার বাস্তব গতিপ্রকৃতির উপর সরাসরি   (direct) প্রভাব থাকে এই সংখ্যালঘু অংশের । কমিউনিষ্ট vanguard-এর সংগঠনকে সেই সময় পার্টি নামে অভিহিত করা যেতে পারে । অন্যদিকে , পরাজয় বা শ্রেণী সংগ্রামে ভাঁটার পরযায়ে , ইতিহাসের তাৎক্ষনিক গতিপ্রকৃতির উপর বিপ্লবীদের আর কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে না । এই প্রতিবিপ্লবী পরযায়ে [শ্রেণী সহযোগিতা , (Class collaboration) , ‘Union sacrees' , ‘প্রতিরোধ সংগ্রাম' (resistance), ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা'(‘Anti-Fascism') ,ইত্যাদির মাধ্যমে ]শ্রমিকশ্রেণীকে নিরস্ত্র ও নিজেদের পক্ষে সমাবেশিত করার বুজোর্য়া তৎপরতার সময় শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠন হিসেবে বেশ ক্ষুদ্রতর আকারের সংগঠনমাত্রই কেবল থাকতে পারে । তাৎক্ষনিক আন্দোলন বা ঘটনার গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করার কোন কাজ আর তার থাকে না । তাকে প্রতিহত করাই অর্থাৎ (প্রতিবিপ্লবী)স্রোতের বিপরীতে দৃঢ়ভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই তার একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে । শ্রেণীর পূর্বের অভিজ্ঞতার সারসংকলন ও শিক্ষাগুলোকে তুলে ধরা এবং এইভাবে শ্রমিকশ্রেণীর ভবিষ্যতের পার্টির জন্য অপরিহারয তাত্ত্বিক এবং কর্মসূচিগত কাঠামো নির্মাণই সেই সময় হয়ে ওঠে তার অত্যাবশ্যক কর্তব্য । শ্রমিকশ্রেণীর এই পার্টির পুনরাবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী রূপেই ঘটবে  শ্রমিক সংগ্রামের পরবর্তী জোয়ারের পরযায়ে । পার্টির পুনরাবির্ভাবের সময় পযর্ন্ত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সেতুর ভূমিকা পালন করে সেই সব গ্রুপ এবং  fraction এর কর্তব্য হয়ে ওঠে , যারা শ্রেণী সংগ্রামের ভাঁটার সময় অধঃপতনের তলদেশে নিমজ্জমান পার্টি থেকে বিচ্ছেদ ঘটায় বা পার্টির অবলুপ্তির পরও টিকে থাকে ।

f.   বিপ্লবীদের সংগঠনের কাঠামো (The structure of the organization of revolutionaries)

প্রলেতারীয় বিপ্লবের চরিত্র অপরিহারযভাবে বিশ্বব্যাপী এবং কেন্দ্রীভূত (centralized) হওয়ায় , শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকেও অতি অবশ্যই বিশ্বব্যাপী এবং কেন্দ্রীভূত হতে হবে । এই পার্টির ভিত গড়ে তোলার কাজে নিযুক্ত fraction এবং গ্রুপ গুলোর মধ্যেও তাই অবশ্যম্ভাবীরূপেই বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রভবন (centralization)   বা কেন্দ্রিকরণের প্রবণতা দেখা যায় ।

পরপর দুটো মহাধিবেশন বা কংগ্রেসের অন্তবর্তীর্কালীন পরযায়ে রাজনৈতিক কাজকর্মের দায়িত্বসম্পন্ন কেন্দ্রীয় কমিতি বা সংস্থার অস্তিত্বের ভিতর দিয়েই বাস্তবায়িত হয় এই কেন্দ্রীভবন বা কেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত । কেন্দ্রীয় কমিটি বা সংস্থা কংগ্রেসের কাছে সমস্ত কাজকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য । বিপ্লবীদের সাংগঠনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে দুটো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়ের উপর গুরুত্ব অবশ্যই দিতে হবে ।

  • সংগঠনের মধ্যে বিপ্লবী সচেতনতার সম্ভাব্য সম্পূর্ণ বিকাশের পথকে সব সময়ই অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে আর তাই non-monolithicসংগঠনে (অর্থাৎ যে সংগঠনে সবরকম মতবিরোধ ব্যক্ত করার অবাধ স্বাধীনতা থাকে ) স্বাভাবিকভাবে উঠে আসা সমস্ত প্রশ্ন ও মতবিরোধের উপর যথাসম্ভব বিস্তৃত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিতর্ক ও আলোচনার পুরো সুযোগ দিতে হবে সংগঠনকে ।
  • একই সঙ্গে সংগঠনের সংঘবদ্ধতা (cohesion) এবং ক্রিয়াকলাপ বা action এর ক্ষেত্রে একতাকেও সুনিশ্চিত করতে হবে । এর অর্থ বিশেষ করে হল এই যে , সংগঠনের প্রতিটি অংশকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অবশ্যই মেনে চলতে হবে ।

একইভাবে সংগঠনের বিভিন্ন অংশের এবং সদস্যদের মধ্যেকার সম্পর্কের উপর অবশ্যম্ভাবীরূপেই পুঁজিবাদী সমাজের দাগ বা প্রভাব থেকে যায় আর তাই পুঁজিবাদী সমাজের ঘেরাবন্দীর ভিতরে সংগঠন কমিউনিষ্ট সম্পর্কের একটা দ্বীপে পরিণত হতে পারে না । তা সত্ত্বেও এইসব সম্পর্ক কিন্তু বিপ্লবীদের লক্ষ্যের একেবারে ঘোর বিপরীতও হতে পারে না । এইসবের ভিত্তি অতি অবশ্যই হতে  হবে পারস্পরিক আস্থা ও সংহতি । কমিউনিজমের উদ্দেশ্য সাধনে ব্রতী শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠনের সদস্যদের যোগ্যতা নিদের্শক বৈশিষ্ট্যই (Hallmarks) হচ্ছে এই পাস্পরিক আস্থা ও সংহতি ।