পালার্মেন্ট ও নিবার্চনের বিভ্রান্তি

The mystification of parliament and elections

পুঁজির উথ্থানের যুগে বুজোর্য়াদের রাজনৈতিক জীবনকে সংগঠিত করার সবচেয়ে উপযুক্ত কাঠামো ছিল পালার্মেন্ট । বিশেষভাবে বুজোর্য়া প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে এটা কখনোই শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি এবং সংসদীয় ক্রিয়াকলাপ ও নিবার্চনে অংশগ্রহনের অবশ্যম্ভাবী বিপজ্জনক ঝুঁকিগুলোর বিরুদ্ধে বিগত শতাব্দীর বিপ্লবীরা সবসময় শ্রমিকশ্রেণীকে সতর্ক ক'রে দিয়েছিলেন ।

যাইহোক, পুঁজির বিকাশের সেই যুগে প্রলেতারিয় বিপ্লব বাস্তব কমর্সূচি হয়ে ওঠেনি এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি-দাওয়া আদায় করার সম্ভাবনাও ছিল যথেষ্ট। ফলতঃ সেই যুগে সংস্কারমূলক দাবী-দাওয়া আদায়ের সংগ্রামে চাপ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় , নিবার্চনী অভিযানকে প্রলেতারীয় কর্মসূচির প্রচার আন্দোলনের জন্য এবং বুজোর্য়া রাজনীতির কলঙ্কজনক দিকগুলোর উন্মোচন ও বিরোধিতার উদ্দেশ্যে , শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পালার্মেন্টে অংশগ্রহণের রণকৌশলকে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। আর সেজন্যই ঊনবিংশ শতাব্দীতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে শ্রমিকশ্রেণী সংগঠিত হয়েছিল, তার মধ্যে সবর্জনীন ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম অনেক দেশেই অন্যতম হয়ে উঠেছিল ।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবক্ষয়ের শুরুর সময় থেকে সংস্কারমুলক দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রামের ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য একটা হাতিয়ার হিসেবে পালার্মেন্টের অস্তিত্বের অবসান ঘটল । কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের (তৃতীয় আন্তর্জাতিক) বক্তব্য অনুযায়ী, এখন রাজনৈতিক জীবনের ভরকেন্দ্র(centre of gravity)পালার্মেন্টের সীমারেখার বাইরে সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্তরূপে অপসারিত হয়ে গেছে' তারপর থেকে পালার্মেন্ট শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির হাতিয়ার হিসাবেই তার ভূমিকা পালন ক'রে আসছে আর এই ভূমিকা পালনের জন্যই তাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। সুতরাং পালার্মেন্টকে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে ব্যবহার করার সমস্ত সম্ভাবনা চূড়ান্তভাবে খারিজ হয়ে গেল। পুঁজির অবক্ষয়ের পরযায়ে, যখন কোনপ্রকার সংস্কার মুলক দাবী দাওয়া আদায়ের বস্তুগত পরিস্থিতিরই অবসান ঘটল তখন রাজনৈতিকভাবে সত্যিকারের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে অসমর্থ একটি বুরজোয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনরূপ সংস্কারমূলক সংগ্রামের সাফল্যের কোন প্রশ্নই আর ওঠেনা। বুজোর্য়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার যতসব প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ পালার্মেন্টেরও ধ্বংস সাধন এবং সাবর্জনীন ভোটাধিকার ও সংশ্লিষ্ট অন্য সবকিছুর ধ্বংসস্তূপের উপর শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাই যখন অবশ্য পালনীয় ঐতিহাসিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, পালার্মেন্ট ও নিবার্চিত সংস্থাগুলোয় অংশগ্রহণের কর্মসূচি, (প্রবক্তাদের অন্তরের বাসনা যাই হোক না কেন), মরণোন্মুখ ঐসব কাঠামোয় নতুন জীবনীশক্তিই শুধু সরবরাহ ক'রে থাকে ।

পালার্মেন্ট ও নিবার্চনে অংশগ্রহণের ফলে গত শতাব্দীর সুযোগ সুবিধার সমস্ত সম্ভাবনা এখন নিঃশেষ । বিপরীত পক্ষে , এখন এপথ ভরা শুধু বিপদে , বিশেষ করে তথাকথিত workers party গুলোর সংসদীয় সংখ্যাধিক্য অজর্নের ফলে ‘শান্তিপূর্ণ পথে' অথবা ‘ক্রমে ক্রমে' সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সম্ভাবনার যতসব মোহাচ্ছন্নতা বজায় থাকার বিপদ ।

নিবার্চন ও সংসদীয় ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ভ্রষ্টাচারগ্রস্ত ও বুজোর্য়া ব্যবস্থার অঙ্গীভূত হয়ে পড়ার ঘটনা ছাড়া , ‘বিপ্লবী' প্রতিনিধিদের দিয়ে ‘ভিতর থেকে পালার্মেন্ট ধ্বংস করার' রণনীতির দ্বিতীয় কোন পরিণতি থাকতে পারে না। ইতিহাস এটা চূড়ান্তভাবে প্রমান ক'রে দিয়েছে।

শেষতঃ, পালার্মেন্টারি ক্রিয়াকলাপ মূলত বিশেষজ্ঞদেরই চিন্তাভাবনার বিষয় ও রাজনৈতিক দলগুলোর কারসাজিরই ক্ষেত্র; ফলে এখানে শ্রমিকদের স্ব-উদ্যোগের মোটেই বিকাশ ঘটে না, বরং আন্দোলন ও প্রচারের হাতিয়ার হিসাবে পালার্মেন্ট ও নিবার্চনকে ব্যবহার করার মধ্যে বুজোর্য়া সমাজের রাজনৈতিক ভিত্তিভূমিকেই বজায় রাখা ও শ্রমিকশ্রেণির নিষ্ক্রিয়তায় উৎসাহ দানের প্রবণতাই থেকে যায়। তৎসত্ত্বেও ইতিহাসের যে পযার্য়ে বিপ্লবের তাৎক্ষনিক সম্ভাবনা ছিল না সেসময় এই সমস্যাটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু পুরনো সমাজব্যবস্থার মূলোচ্ছেদ এবং কমিউনিষ্ট সমাজের নিমার্ণই যখন একমাত্র ঐতিহাসিক কর্মসূচি হয়ে উঠেছে এবং শ্রেণির সমস্ত অংশেরই সচেতন সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া যখন তা সম্ভব নয় তখন এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক শ্রেণির লক্ষ্যের পথে চূড়ান্ত একটা বাধা।

‘বিপ্লবী পালার্মেন্টবাদ'-র (Revolutionary Parliamentarism) রণকৌশলের দারুন ক্ষতিকারক পরিণতি থেকে এটা পরিষ্কার যে, এটা আসলে বুজোর্য়া শ্রেণী স্বার্থেরই পরিপূরক, যদিও তা শুরুতে ছিল মূলতঃ শ্রমিকশ্রেণি ও তার সংগঠনগুলোর উপর অতীতের চিন্তাভাবনার প্রভাবেরই প্রতিফলন ।