Communist Internationalist - 2010s

Communist Internationalist - 2010

ইন্টারন্যাশানাল কমিউনিস্ট কারেন্টের প্যান এশিয়ান কনফারেন্স ফেব্রুয়ারি ২০১০ (Pan Asian Conference of the ICC February 2010)

২০১০-র ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আইসিসি তার এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত সেকসনগুলোকে নিয়ে একটি সম্মেলন করে। সম্মেলনে ফিলিপাইন্স, তুর্কি এবং ভারতের সেকসনগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আইসিসির প্রতি সহমর্মী ছাত্র, যুব এবং শ্রমিকেরা উপস্থিত ছিলেন; ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী গ্রুপের প্রতিনিধিও। কোরিয়ার দুটি ইন্টারন্যাশানালিস্ট গ্রুপ যাঁরা আইসিসির কংগ্রেসে উপস্থিত ছিলেন তাঁরাও আমন্ত্রিত ছিলেন কিন্তু তাঁরা শেষপর্যন্ত উপস্থিত হতে পারেননি, তবে সম্মেলনের প্রতি তাঁদের সংহতি ও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন তাঁরা। পাঠিয়েছেন কোরিয়ার শ্রেণিসংগ্রামের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি বিবৃতি।

এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য আইসিসির অষ্টাদশ কংগ্রেসে নির্ধারিতকর্তব্যগুলো সমাধা করার কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী যে আন্তর্জাতিকতাবাহিনীর উদ্ভব ঘটছে তার ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং সেই ক্রিয়াকলাপের আরো বিকাশ ঘটানোও এই সম্মেলনের একটি লক্ষ্য। আইসিসির ১৮তম কংগ্রেসে আন্তর্জাতিকতাবাদী গ্রুপ এবং মিল্যুর(milieu) মধ্যে সহযোগিতার বিকাশ ঘটানো বর্তমানে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে স্থির হয়েছিল। এই সম্মেলনেও তাই এটা একটা মুখ্য ফোকাস হিসাবে কাজ করেছে।
একটা গভীর দুঃখের খবর দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। আমরা জানতে পারি মাত্র দুদিন আগে আমাদের ইউএস(USA) সেকসনের কমরেড জেরি মারা গেছেন। তিনি ছিলেন আমেরিকান সেকসনের একটি স্তম্ভস্বরূপ, বহু বছর ধরে তিনি আইসিসির কাজ করে গেছেন। সম্মেলন তাঁর পরিবার এবং সেকসনের প্রতি সৌভ্রাতৃত্ব জ্ঞাপন করে।
কনফারেন্সে প্রদত্ত রিপোর্ট (Reports to the Pan Asian Conference):
কনফারেন্সে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে রিপোর্ট পেশ করা হয়। যেমন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট,এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী বিরোধ, আইসিসির কর্মকান্ড। এছাড়া প্রলেতারীয় বিতর্কের অনুশীলন ও অভ্যাস এবং তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ, ভারত এবং ফিলিপাইন্সের জাতীয় অবস্থা এবং শ্রেণি সংগ্রাম, এশিয়ার বিভিন্ন সেকশনের কাজকর্ম ইত্যাদি  বিষয়ে রিপোর্ট পেশ করা হয়।
তিনদিন ধরে এই সমস্ত রিপোর্ট এবং সেসব থেকে উ্ঠে আসা প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীর আগ্রহ ও আন্তরিকতাসহ আলোচনা ও ডিবেট চলে। তবুও আলোচ্য সমস্ত প্রশ্নে যথেষ্ট গভীরতায় ও স্বচ্ছতায় পৌঁছনো যায়নি। এখানে সমস্ত আলোচনার বিশদে যাওয়া যাবে না তবে তুলনামূলকভাবে গুরুত্ত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আমরা আমাদের রিপোর্ট পেশ করবো।
এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী বিরোধ(Imperialist Rivalries in Asia)
বিশদ রিপোর্ট আমাদের ইংরাজী সাইট (www.en.internationalism.org)-এ পাওয়া যাবে। এবিষয়ে পেশ করা রিপোর্ট আমাদের ১৮তম কংগ্রেসে সাম্রাজ্যবাদী টেনসন বিষয়ে প্রদত্ত রিপোর্টের মূল দৃষ্টিভঙ্গীর ওপরে ভিত্তি করেই রচিত এবং আলোচিত।
ইউএসের(USA) ক্ষমতা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে অন্যদিকে চীন আন্তর্জাতিকস্তরে একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ পাওয়ার হয়ে উঠছে। এই বিষয়টা আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পাশাপাশি এশিয়াতে সাম্রাজ্যবাদী আঁতাত এবং দ্বন্দ্ব-বিরোধে এর প্রভাব কী হতে পারে তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয় এই আলোচনায়। 
সম্মেলনে এবিষয়ে কারো কোন সন্দেহই ছিল না যে আমেরিকা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া সত্ত্বেও এখনও সেটা বিশ্বে এক নম্বর মহাশক্তিধর দেশ এবং চীনের এই মুহূর্তে আমেরিকাকে সম্মুখসমরে মোকাবিলা করার সামর্থ বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। চীন কতটা দ্রুতগতিতে মহাশক্তি হিসাবে উথ্থানের পথে এগিয়ে চলেছে এবং এখনই বা অদূর ভবিষ্যতে সে আমেরিকাকে চ্যালেন্জ করতে পারবে কিনা এই বিষয়টার ওপর কয়েকজন দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
 কনফারেন্সে এ্শিয়ায় ক্রমবর্দ্ধমান সমরসজ্জা ও সামরিকীকরণের ওপর গুরুত্ত্বপূর্ণ বিতর্ক হয়। পৃথিবীর মধ্যে এশিয়া এখন অস্ত্র-শস্ত্রের অন্যতম প্রধান বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন যুদ্ধাস্ত্রে বিনিয়োগের ব্যাপারে এক নম্বরে এটা ঠিকই, তবে, ভারত, সৌদি আরব, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশগুলোও এব্যাপারে পিছিয়ে নেই। চীন এবং ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও গুরুত্ব এবং ক্রমবর্ধিত সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খাই তাদের এই বেশি বেশি সমরাস্ত্রসজ্জিত হওয়ার মূল কারণ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রমবর্ধমান মিলিটারাইজেসনের পিছনে আমেরিকার পতনোন্মুখ অবস্থা এবং চীন দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা একটা বড় কারণ।
বর্তমানে ইউএসএ আফগান-পাক যুদ্ধের প্রতিই বেশি নজর দিচ্ছে। এটা ঠিকই যে আমেরিকা আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে অস্থিরতামুক্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত করতে চাইছে কিন্তু আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানই এখন আমেরিকার বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কনফারেন্সের কাছে এটাও পরিষ্কার যে আমেরিকা এখনই আফগানিস্তান পাকিস্তানের রণাঙ্গণ ছেড়ে যাচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে সেনা সংখ্যা কমালেও আফগানিস্তানে তাদের নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা বজায় রেখেই চলবে।
আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদীজোটের ভাঙা গড়ার প্রক্রিয়াটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক তিক্ত ও মারাত্মক রেষারেষি শুধু আজকের নয়, সবসময়ের। এটা এখন আফগানিস্তানে দুজনের মধ্যেকার পরোক্ষযুদ্ধে প্রসারলাভ করেছে।এই্ দুই দেশ পরস্পরের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হতে না চাইলেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের(volatile) চরিত্রটা মাথায় রেখে বলা যায় যেকোন সময় হঠাতই সামরিক সংঘাত বেধে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার যেমন ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে আক্রমণের পর দুদেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল।
গত কয়েক বছর ধরে চীন ও ভারতের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ সংঘাত বেড়ে চলেছে। ফলে ভারত, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কটা আরো গভীর ও বিস্তৃত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান ঐতিহাসিক যুগে চাচা আপন প্রাণ বাঁচার প্রবণতা দারুণভাবে জোরদার হওয়ার ফলে এই সম্পর্কেও ভাটার টান দেখা দিয়েছে। ভারত এখন রাশিয়ার মত পুরোণো মিত্রদের দিকে ঝুঁকতে চাইছে।
আলোচনায় অন্যান্য যেসব বিষয় উঠে আসে তার মধ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোও আছে:
-জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় দ্বন্দ্ব কে শ্রমিকশ্রেণির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা
-সংকট এবং সাম্রাজ্যবাদী টানাপোড়েনের মধ্যে সম্পর্ক।
-পুঁজিবাদের পচন এবং(Post war imperialist block)ব্লক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং চাচা আপন প্রাণ বাঁচা এই প্রবণতাবৃদ্ধি।
শ্রেণি-সংগ্রাম (Class Struggle )
 কনফারেন্সের অংশগ্রহণকারীরা এই বিষয় নিয়ে অত্যন্ত উজ্জীবিত ছিলেন। উপস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে আজকের শ্রেণি সংগ্রামের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
২০০৩ সালে শ্রমিকশ্রেণি শ্রেণি-সংগ্রামের একটি নতুন বাঁকে(turning point) উপস্থিত হয়েছে। এসময় শ্রেণি নতুন করে বুরজোয়ার বিরুদ্ধে তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। কিন্তু ২০০৮-এ আকস্মিক প্লাবনের মত সংকট আছড়ে পড়ল। এর ফলে এক লহমায় শ্রমিকশ্রেণির ওপর নেমে আসা তীব্র আক্রমণগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে শ্রমিকশ্রেণি কিছুটা যেন হতচকিত, আতঙ্কিত, দ্বিধাগ্রস্ত বা কিছুটা যেন অবশ(paralized) হয়ে পড়ল। এখন প্রশ্ন শ্রেণি কি এই অবস্থাটা অতিক্রম করতে পেরেছে? ইউএস এবং ইউরোপে যে নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকশ্রেণির ওপর পড়েছে, এশিয়ার শ্রমিকশ্রেণির ওপর কি তার প্রভাব একইরকম? বর্তমান পরিস্থিতি কি ভয় এবং থমকে থাকা অবস্থা থেকে বাইরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে? এসবের সুনির্দিষ্ট উত্তর যদিও আসে নি তবে সাধারণভাবে আলোচনায় একথা উঠে এসেছে যে বর্তমান সংগ্রাম তার সাময়িক ছত্রভঙ্গ অবস্থা থেকে মুক্ত হবার প্রয়াসকেই সূচিত করছে। তাছাড়া আজকের সংগ্রামগুলো আন্তর্জাতিকস্তরে বিকশিত হবার দিকেই প্রসারিত এবং এই সংগ্রাম একটা বা দুটো দেশের ব্যাপার নয় সারা পৃথিবীতেই তা গড়ে উঠছে।
পাশাপাশি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে সংগ্রামের ধীরগতি বিকাশের প্রশ্নটা। ১৯৬৮ এবং তার পরবর্তী সময়ের তুলনায় আজকের সংগ্রামে শ্রেণির আত্মবিশ্বাসের ধীরগতি বিকাশের দিকটাও আলোচনায় উঠে আসে। ২০০৩ এ শ্রেণির পুনরায় (historical)মঞ্চে আসার সময় থেকেই ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে ওঠার ব্যাপারটা একটা বৈশিষ্ট হিসাবেই পরিলক্ষ্যিত হচ্ছে।আজ অব্দি এইধারা বজায় আছে। এর কারণ আজকের দিনে সংগ্রামের বর্শামুখের প্রকৃতি: সাধারণভাবে এই সঠিক বিশ্বাস আছে যে এই অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির কোন সম্ভাবনা আর নেই; আর তাই এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রেণিকে এই সংকটের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এবং তার থেকে উঠে আসা শিক্ষাগুলো সারসংকলন করতে হচ্ছে।
আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে সংকটের গভীরতার সঙ্গে শ্রেণির প্রতিক্রিয়ার কোন যান্ত্রিক সম্পর্ক নেই; তাই এটা ভাবা ঠিক নয় যে সংকট গভীর হলেই শ্রমিকশ্রেণির প্রতিক্রিয়াও তৎক্ষণাৎ বিশাল বিস্ফোরণের আকারে ফেটে পড়বে। তাসত্ত্বেও ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশের সাথে সাথে ভারতেও কিছুকিছু সংগ্রামে শ্রেণি-সংহতির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটছে। পরপর ঘটতে থাকা সংগ্রামগুলো থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্র (sector)-র মধ্যে সংগ্রাম বিস্তারের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
তুরকি, ফিলিপাইন্স এবং ভারতের শ্রেণিসংগ্রাম বিষয়েও কিছু বিশেষ আলোচনা হয়। ভারতে বিশেষতঃ গুরগাঁও-এ অটো কোম্পানীর শ্রমিকের আন্দোলন, গুজরাটের হীরা শ্রমিকদের আন্দোলন আলোচিত হয়। তবে সবার মধ্যে একটা অনুভূতি ছিল যে আলোচনাটা আরো গভীরে যাওয়ার দরকার ছিল। বিশেষতঃ শ্রেণির মধ্যে সচেতনতা বিকাশের ব্যাপক প্রয়াস কিভাবে সম্ভব হয় এবং কিভাবেই বা শ্রেণি মাস-স্ট্রাইকের স্তরে পৌঁছবে এইদিকগুলো আলোচিত হওয়া এবং বোঝা দরকার। এইদিকটাকে সামনে রেখে রিজলিউসন(resolution) নেওয়া হয় যে কনফারেন্সের পরে এনিয়ে আলোচনা এবং বিতর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
ভারত এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর বিশেষত্ব নিয়েও আলোচনা হয়:
ভারত, চীন এবং অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলোয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি (boom ) নিয়ে বুর্জোয়া প্রচারের প্রভাব;
জাতীয়তাবাদ এবং জাতিগত বিভাজন এবং তার দরুন লেগে থাকা দ্বন্দ্ব;
নানবিধ ধর্ম, জাতপাত এবং বহুবিধ ভাষার প্রভাব;
বিশাল সংখ্যক জনগন কৃষক;
কিভাবে শ্রেণির কাছে আমাদের বক্তব্য নি্য়ে যাওয়া হবে এই প্রশ্ন গুরুত্ব পায়; আইসিসির এবং এশিয়ার অন্তর্গত তার বিভিন্ন সেকশনের কাজকর্ম সংক্রান্ত আলোচনায় এই প্রশ্ন আরো বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়।
আইসিসির জীবনধারা (Life of the ICC)
ল্যাটিন আমেরিকায় আন্তর্জাতিকতাবাদী কিছু গ্রুপ এবং ব্যক্তির সঙ্গে চলা কাজের উল্লেখসহ প্রসঙ্গটি উপস্থাপিত হয়। এ প্রসঙ্গে কালচার অফ ডিবেট, টেস্ট ফর থিয়োরি, ট্রান্সমিসন অফ এক্সপেরিয়েন্স, মানবিক দৃষ্টিকোণ এবং বস্তুগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে একজন সদস্যের কার্যকলাপের মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়।
আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সংগঠনের ধারার মধ্যে শুধু আইসিসি নেই; এর মধ্যে নানাবিধ ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়ে উঠে আসা অন্যান্য আন্তর্জাতিকতাবাদী গ্রুপ আছে। আইসিসি সামগ্রিকভাবে এই শক্তিটাকে আরো শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করছে, এর ভেতরে থাকা বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাইছে । ভবিষ্যতেও এই একসাথে কাজ করার ব্যাপারটাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য সক্রিয় হওয়া অবশ্যই দরকার। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী এই শক্তিটার আরো শক্তিশালী হওয়া মানে আমাদেরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা।
বিতর্কের অনুশীলন ও অভ্যাস, তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতার সঞ্চালন ও আদান প্রদান(Culture of Debate, Taste for Theory and Transmission of Experience)
এই আলোচনায় একথা মনে করা হয় যে শ্রমিক শ্রেণি সচেতনতা অর্জনে সক্ষম শ্রেণি। শ্রেণি সচেতনতার ক্রমাগত বিকাশ না ঘটিয়ে এবং দুনিয়াজোড়া ঐতিহাসিক শ্রেণি-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার সারসংকলন না করে শ্রমিক শ্রেণি তার সংগ্রামকে পূর্ণ বিকশিত করতে এবং পুঁজিবাদ উচ্ছেদের কাজ সফল করতে পারে না।
ঐতিহাসিক এই অভিজ্ঞতার প্রাসঙ্গিকতাকে সামনে রেখে এবং বর্তমানে বিপ্লবী দিশার খোঁজে থাকা মানুষজনের সংখ্যা বাড়তে থাকার বাস্তবতাকে লক্ষ্য করে শ্রমিক-শ্রেণির সংগ্রাম,সংগঠন এবং সচেতনতার অভিজ্ঞতা এই নতুন প্রজন্মে সঞ্চালিত করার কাজে আইসিসির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে আইসিসি মনে করে। সর্বত্রই এই ট্রান্সমিসনের কাজ গুরুত্বপূর্ণ; এশিয়ায় যেখানে কোনদিনই কোন কম্যুনিস্ট সংগঠন ছিল না, যেখানে বামপন্থী এবং জাতীয়তাবাদী শক্তি সর্বদাই নিজেদেরকে কম্যুনিস্ট হিসাবে উপস্থিত করেছে সেখানে এই কাজ আরো বিশেষভাবে জরুরী।
কিন্তু এই কাজটা ইস্‌কুল-মাস্টারী করার মত একমুখী বিষয় নয় যে শিক্ষক শুধু শিক্ষা দিয়ে যাবেন আর স্টুডেন্টরা তা গ্রহণ করবে। বিপরীতে এ হল একটা বিপ্লবী কাজ। এই প্রক্রিয়া সর্বদাই দ্বিমুখী। একাজ করতে গেলে নতুন প্রজন্ম কী বলতে চাইছে তা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব নতুন প্রশ্ন উঠে আসছে সেগুলোর প্রতি চিন্তার জগৎ খোলা রাখতে হবে, খোলা মনে ভাবতে হবে এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে,যেসব নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে সেগুলো নতুনভাবে খোলামনে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঞ্চালনের উদ্দেশ্যে আইসিসির অভ্যন্তরে এবং চারপাশের অনিসন্ধিৎসু মানুষজনের মধ্যে বিতর্কের পরিমন্ডল গড়ে তুলতে হবে। তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ সৃজনও এই প্রক্রিয়ার একটা অংশ। উপস্থিতদের একটা বড় অংশই এর প্রাসঙ্গিকতাকে তুলে ধরেন।
এক্ষেত্রে উনবিংশ শতকের শেষভাগের এবং বিংশ শতকের শুরুর দিককার বিপ্লবী সংগ্রামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করা হয়। এই সময়ে বিপ্লবীরা শুধু শ্রেণির ও শ্রেণি সংগ্রামের বস্তুগত অবস্থাই স্টাডি করেছেন তা নয়, সমসাময়িক বিজ্ঞানের বিকাশ সম্পর্কেও যথেষ্ট অধ্যয়ন করেছেন, বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গীতে সেসব পর্যালোচনা করেছেন, সার সংকলন করেছেন, শ্রেণির তাত্ত্বিক সচেতনতা বিকাশে কাজে লাগিয়েছেন। এই সময়টায় গভীর তাত্ত্বিক আগ্রহ এবং অনুশীলন হয়ে উঠেছিল বিপ্লবী কর্মকান্ডের গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশ।
আজ, দীর্ঘ প্রতিবিপ্লবী পর্যায় পার করার পর এই কাজ কঠিন বলেই মনে হয়। তবে শ্রমিকশ্রেণিকে যদি তার ঐতিহাসিক লক্ষ্যে পৌঁছোতে হয় তাহলে তাকে অবশ্যই এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতেই হবে।
বিতর্কের পরিমন্ডল গড়ে তোলা বা তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তোলার পথে বাধাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কতকগুলো ইম্‌পর্ট্যান্ট বাধা হল:
·       বুরজোয়া মতাদর্শের প্রভাব;
·       পুঁজির পচনশীলতার পর্যায়ের প্রভাব যা সুসংহত চিন্তাধারা গড়ে তোলাকে অবদমিত করে।
·       ভারতের মত দেশে সামন্ততান্ত্রিক এবং জাতপাতগত ঐতিহ্য গুরুজনদের মেনে চলা, গুরুকে অনুসরণ করা ইত্যাদি ধ্যান-ধারণাকে জোরদার করে, বিপরীতে নিজের স্বাধীনভাবে চিন্তাকরা ও সবকিছুকে প্রশ্ন করার প্রবণতাকে অবদমিত করে।
·       মাওবাদের প্রভাব: একটি বুরজোয়া ধারা হিসাবে এটি নেতাকে মান্য করে চল এই নীতিকেই প্রতিষ্ঠা করে, শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাস ও তত্ত্বের প্রতি আগ্রহটাকে খুবই সন্দেহজনক চোখে দেখে।
মাওবাদী অভিজ্ঞতা যাদের আছে সেইসব কমরেডরা মনে করিয়ে দেন মাওবাদী থিসিসটার কথা যাতে বলা হয়েছে: যত পড়বে তত বোকা বনবে
সচেতনভাবে ডিবেটের কালচার গড়ে তোলা এবং তত্ত্বের প্রতি আগ্রহ বিকশিত করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আলোকপাত করা হয়। বলা হয় নতুন প্রজন্মে অভিজ্ঞতার সঞ্চালন এবং তাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার কাজে উপরোক্ত কাজের গুরুত্ত্ব অনস্বীকার্য।
বিপ্লবীদের কাজের গভীর মানবিক চরিত্র (The profoundly human character of militant activity)
আইসিসির জীবনছন্দের অন্তর্গত অপর একটি প্রশ্ন আলোচনায় জায়গা করে নেয়: এটা হল একটা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার বাহিনীর কাজকে দেখার প্রশ্ন। আমাদের রাজনৈতিক অনুশীলন এবং সামাজিক জীবনযাপন এই দুয়ের মধ্যে যেকোন রকম বিভেদ রেখা টানার প্রয়াসকে আলোচনায় বেঠিক বলে চিহ্নিত  করা হয়। একইসঙ্গে পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে কম্যুনিজমের কোন  বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানানোর আইডিয়াকেও যৌক্তিকভাবে পরিত্যাগ করা হয়। পাশাপাশি এটাও বলা হয় যে আমাদের জীবনযাপন প্রণালী কম্যুনিজমের মূলদিকগুলোর একদম বিপরীতও হতে পারে না।
নারীদের প্রসঙ্গও একট বিশেষ জায়গা করে নেয়। এক্ষেত্রে সাধারণভাবে সকল নারীর এবং বিশেষভাবে যাঁরা বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের অংশ সেইসব নারীদের প্রতি কম্যুনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গী কী হওয়া উচিত সেবিষয়ে আলোকপাত করা হয়। বিপ্লবীদের এই কনফারেন্সে এই বিষয়টা অনেক সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপারে বিতর্কের বিষয় বলে মনে হলেও এটা ঠিক যে ভারত, তুর্কি এবং ফিলিপাইন্সে মেয়েদের প্রতি সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীর একটা বিষময় প্রভাব আছে এবং সেদিক থেকেই বিষয়টার প্রাসঙ্গিকতা আছে। প্রকৃতপক্ষে আইসিসির প্রতি সহমর্মী একজন মহিলা সাথী  প্রশ্নটাকে সজোরে সামনে আনেন। তিনি দেখান পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ভারতে আইসিসির সহমর্মী  মানুষজনের মধ্যেও বিদ্যমান।
সময়াভাবে এই্ আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি তবে সেকসনগুলোকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় যাতে তারা এ বিষয়ে সেকসনে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যায়।
ইন্টারভেনসন (Intervention):
ফিলিপাইন্সে সদ্যজাত সেকসন দ্বারা যে বিপুল কাজ ইতোমধ্যেই করা হয়েছে তাকে কনফারেন্স স্যালুট জানায়। বিশেষত, যে পরিস্থিতির মধ্যে সেকসনকে এই কাজ করতে হয়: আধা বে-আইনি অবস্থার মধ্যে, রাষ্ট্রীয় এবং বাম ডান নানা দলের নিজস্ব সেনাবাহিনীর দ্বারা নিপীড়ণের থ্রেটকে মাথায় রেখে এবং খুবই কষ্টকর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে সংগ্রাম করেই এইসব কাজ করে চলতে হয়।
ইন্টারভেনসনের প্রশ্নে দীর্ঘ, প্রাণবন্ত বিতর্ক চলে। এই আলোচনা অনেকগুলো প্রশ্নে স্বচ্ছতা এনে দেয়:
ইন্টারভেনসনের নানা হাতিয়ার এবং রূপ যথা পামফ্লেট(pamphlet), পত্র-পত্রিকা, লিফলেট, আলোচনা চক্র, কনট্যাক্ট মিটিং, পাবলিক মিটিং ইত্যাদি।
তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বচ্ছতা এবং গভীরতা অর্জন ইন্টারভেনসনের অপরিহার্য অঙ্গ এবং রূপ।
থিয়োরি এবং প্র্যাকটিসের মধ্যে ঐক্য।
এই আলোচনার একটি সুনির্দিষ্ট প্রসঙ্গ ছিল ভারতে থাকা সেকসনের কাজকর্মের একটি ব্যালান্স সীট উপস্থাপন। এই মূল্যায়ণে উল্লেখ করা হয় যে:
গত কয়েকটা বছর সেকসন সংখ্যার দিক থেকে বেড়ে ওঠা এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন গড়ে তোলার ওপরই বিশেষ জোর দেয়।
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় উদীয়মান নতুন অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিদের সঙ্গে ফলপ্রসূ এবং গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা আলাপ আলোচনা চালানো গেছে। এতে করে ভারতে কম্যুনিস্ট চিন্তাভাবনার প্রভাব ছড়ানোর কাজই করা হয়েছে এবং তা আইসিসির আন্তর্জাতিক কর্মকান্ডকেই প্রসারিত করেছে।
পাশাপাশি মূল্যায়নের খাতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, যেমন:
এখনও অব্দি ভারতে রেগুলার প্রকাশনার কাজ শুরু করতে না পারা।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে আমাদের ইন্টারভেনসন অনিয়মিতই থেকে গেছে। ভারতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্রমিক আন্দোলনে আমাদের কোন ইন্টারভেনসনই হয়নি।
শেষোক্ত ব্যাপারটা নিয়ে আইসিসিরই কিছু সহমর্মীও প্রশ্ন তোলেন; এতে আলোচনাটা আরো গভীরতা পায়।
এই ডিসকাসন্‌টা আমাদের সহমর্মী এবং সেকসন উভয়ের পক্ষেই খুবই উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে ওঠে। সহমর্মী কমরেডরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আইসিসির জন্য লিখতে, আইসিসির নানা টেক্সট অনুবাদ করতে, পত্রিকা বিলানোর কাজে সাহায্য করতে এবং শ্রেণি-সংগ্রামে ইন্টারভেইন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
উপসংহার (Conclusion)
সংগঠনের জীবনে প্যান এশিয়ান কনফারেন্স একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং এশিয়ায় কম্যুনিস্ট ভাবধারা এবং সংগঠন বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হয়ে রইল। যদিও সংখ্যাগতভাবে বিশাল কিছু নয়, তবুও সম্ভবত এশিয়ায় এখনও অব্দি এটাই কমিউনিস্ট এবং আন্তর্জাতিকতাবাদীদের সবচেয়ে বড় জমায়েত। আইসিসির অনেক সহযোদ্ধা ও সহমর্মীদের কাছে আইসিসির আন্তর্জাতিক সভায় থাকার এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা। কমরেডদের মনে হয়েছে এটা যেন আইসিসির কংগ্রেসের ছোট সংস্করণ।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সহমর্মীদের কাছে এই সম্মেলন এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। তাদের মতে এই সম্মেলন তাদের কাছে এমন একটা সংগঠন সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা যেটা শুধু আন্তর্জাতকতাবাদীই নয়, তাদের কর্মক্ষেত্রে তারা সত্যিসত্যিই আন্তর্জাতিক। অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা তরুণ কমরেডের ভাষায় এই কনফারেন্সের অভিজ্ঞতা তার জীবনের দিশাটাকেই বদলে দিয়েছে এবং কমিউনিস্ট হিসাবে কাজ করার প্রশ্নটা নতুনভাবে হাজির করেছে।
সম্মেলনের শেষে ভারতের একজন সহমর্মী সাথী সম্মেলন সম্বন্ধে তার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এইভাবে: সম্মেলন চলাকালীন আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি আমার দেশে আছি। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিপ্লবী সাথীদের সঙ্গে কাজ ও আলোচনা করতে করতে অনুভব করছিলাম আমি আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির জীবন এবং সংগ্রামেরই অংশ”
এই অনুভবটা আসলে সকলের মধ্যেই ব্যপ্ত ছিল। এই প্যান এশিয়ান কনফারেন্স সকলের মধ্যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বচ্ছতা এবং উদ্দীপনা জুগিয়েছে।

সাকি, ৪ই এপ্রিল, ২০১o

কলকাতার চটকল শ্রমিকের সংগ্রামে ইউনিয়নগুলোর অন্তর্ঘাত (স্যাবোটাজ)

 কলকাতার নিকটবর্তী ৫২ টি জুটমিলের প্রায় আড়াইলক্ষ শ্রমিক ২০০৯-র ডিসেম্বরের শুরুতেই ধর্মঘটে নামে। মজুরী বাড়ানো, অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত বহুসংখ্যক শ্রমিকের স্থায়ীকরণ, অবসরকালীন সুযোগ সুবিধা প্রদান এবং জীবনযাপনের মান উন্নয়ন ও কারখানায় নানান অসুবিধাজনক পরিস্থিতির বদল ইত্যাদি নানা দাবীতে এই ধর্মঘট। সর্বোপরি, বকেয়া বেতন আদায়, স্বাস্থ্য বীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য খাতে কেটে নেওয়া টাকা শ্রমিকদের নামে যথাযথভাবে জমা দিতে বাধ্য করা ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম দাবী। দুমাস ধরে চলার পর ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০১০ ইউনিয়নগুলো ধর্মঘট প্রত্যাহার করে এবং শ্রমিকদের কাজে যেতে নির্দেশ দেয়, যদিও ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে কোন দাবী আদায়ে তারা সমর্থ হয়নি। বরং এই পরাজয় শ্রমিকশ্রেণির ওপর আর একটা আক্রমণের মঞ্চ তৈরি করল।

চটকল শ্রমিকদের এই ধর্মঘট প্রতিবছরেই
চটকল শ্রমিকদের এই সাম্প্রতিক স্ট্রাইক প্রথম নয়। প্রায় প্রতি বছর তাঁরা ধর্মঘট করেন। ২০০২, ২০০৪, ২০০৭-এ ৬৩ দিনের টানা ধর্মঘট এবং ২০০৮-এর ১৮দিন ধর্মঘটের কথা আমরা মনে করতে পারি। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই শ্রমিকসাধারণের কর্তপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার প্রয়াস বা সামান্য দাবী আদায়ের প্রচেষ্টা ইউনিয়ন এবং চটকল কর্তপক্ষের মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলে ব্যর্থ হয়েছে।
চটকল মজুরদের বারংবার বিক্ষোভে ফেটে পড়ার কারণ নিহিত আছে তাদের কর্মক্ষেত্রের অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে, নিহিত আছে স্ট্যালিনিস্ট এবং অন্যান্য ইউনিয়ন ও পার্টির দমন পীড়ণের মধ্যে যাদিয়ে তারা শ্রমিকদের বিক্ষোভকে নিজেদের মুঠির মধ্যে রাখতে চায়। অনেক চটকল চালানোর ক্ষেত্রে স্থায়ী কিছু সমস্যা থেকে যাওয়াও শ্রমিকদের আন্দোলনে যেতে বাধ্য করে।
চটকল মজুরদের বেতন অত্যন্ত কম। এমনকি স্থায়ী শ্রমিকদের বেতন মাসে ৭০০০ টাকা মানে কিনা মোটামুটি ১৫০ ইউএস ডলার বা বর্তমান হিসাবে ১০০ ইউরোর কাছাকাছি। প্রতিটা মিলে একতৃতীয়াংশের বেশি মজুর অস্থায়ী বা চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত যাদের বেতন স্থায়ী শ্রমিকদের অর্ধেকের কম, মানে ডেলি ১০০ টাকা। পরন্তু, যেদিন কাজ করানো হবে শুধু সেইদিনের বেতনই দেওয়া হবে! এইসব অস্থায়ী কর্মীরা জীবনের অধিকাংশ সময় একটা মিলে কাজ করেই জীবন কাটিয়ে দেন; তা সত্ত্বেও তাঁদের স্থায়ী করা হয় না কেননা মালিক তা চায় না। এমনকি শ্রমিকেরা তাদের মাসিক বেতন নিয়মিত এবং পুরোপুরি  পান না; আন্যান্য দেয় বেনিফিটের টাকাও মেলে না।এইসব টাকা বছরের পর বছর জমতে থাকা সত্ত্বেও মেটানো হয় না। এমনকি আইনসঙ্গতভাবে স্বাস্থ্যবীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা দেওয়ার জন্য টাকা কেটে নিলেও অনেকসময় ম্যানেজমেন্ট সেটাকা শ্রমিকদের নামে সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরে জমা করেনা। এ বিষয়ে সংঘবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও মালিকেরা সেই সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখায়। শ্রমিকদের ওপর আরো বেশিমাত্রায় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য চাপিয়ে দেবার জন্য মালিকেরা লক-আউট ঘোষণা করে, বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বসেরা একাজ চালিয়ে যেতে পারে কারণ চলতি বামফ্রন্ট সরকার সহ যত স্ট্যালিনিস্ট ও্ অন্যান্য ইউনিয়নগুলো তাদেরই দোসর। প্রতিটা চুক্তির ক্ষেত্রে সরকার নিজেই একটা পার্টি, তবুও কোন চুক্তিলাগু করার জন্য সরকার কোন প্রয়াসই নেয় না। সোজা কথায় সরকার নিজস্ব শ্রম আইন নিজেই ভাঙে।
এইসবের ফলে শ্রমিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে, যার ফল হল তাদের এই বারবার করে সংগ্রামে নামা। 1990-র প্রথমদিকে ভিক্টোরিয়া এবং কানোরিয়া জুটমিলের শ্রমিকদের মধ্যে এই তীব্র ক্ষোভের প্রকাশই আমরা দেখি; এখানে তারা প্রচলিত সমস্ত ইউনিয়নকে বয়কটই শুধু করেনি, এমনকি ভিক্টোরিয়ার শ্রমিকরা সমস্তধরণের ইউনিয়নের অফিস আক্রমণ করে, অফিস ভাংচুড় করে, মারধর করে ইউনিয়ন বসেদের। কানোরিয়ার শ্রমিকেরা সমস্ত প্রচলিত ইউনিয়ন বয়কট করে এবং বহুদিন ধরে মিল দখল করে।
কিন্তু বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ বামপন্থীদের মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে আছে; গত ৩২ বছর ধরে রাজত্ব করা স্ট্যালিনিস্ট হায়নারাই শুধু আছে তা নয়, এদের পাশাপাশি আছে বিরোধী বামপন্থী দলবল, আছে এনজিও, বামপন্থী বুদ্ধিজীবির দল। ফলে, কানোরিয়া বা ভিক্টোরিয়ার শ্রমিকদের প্রচলিত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার প্রয়াসকে সরকার বিরোধী বামপন্থীরা খুব দ্রূত ক্যাপচার করে নেয়; আন্দোলন বেপথু হয়ে পড়ে। প্রচলিত ইউনিয়নগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকের স্বতঃস্ফূর্ত্ত ঘৃণাকে ব্যবহার করে এরা  নতুন মোড়কে সেই একই ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির খপ্পরেই তাদের এনে ফেলে। এখনও অব্দি এই হল পশ্চিমবাংলার চটকল শ্রমিক সংগ্রামের করুণ পরিণতি।এই বাস্তবতা থেকে এটা বোঝা যায় শ্রমিক সংগ্রামে সত্যিকারের শ্রমিক শ্রেণির চিন্তাধারা গড়ে তোলা কী ভীষণভাবে প্রয়োজনীয়।
বর্তমান ধর্মঘট
পাঁচ পাঁচটা ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর শ্রমিকদের বিক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ২০টা ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে ১৪ই ডিসেম্বর থেকে ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হয়। বকেয়া বেতন মেটানো, স্বাস্থ্য বীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে দেয় টাকা সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরে জমা করা এবং বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি দাবীতে এই ধর্মঘট ডাকা হয়। খবর অনুযায়ী গড় পরতায় শ্রমিক পিছু ৩৭০০০ টাকা পর্যন্ত বকেয়া আছে যা প্রায় তাদের ছ মাসের বেতনের সমান। এগুলো না দেওয়া মানে শ্রমিকের পয়সা স্রেফ চুরি করা। পরন্তু স্বাস্থ্য বীমা এবং পিএফে টাকা না দেওয়ার অর্থ চিকিৎসা পরিসেবা না পাওয়া, রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট আটকে যাওয়া।
ধমর্ঘটের ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকার চাপের মুখে পড়ে, তাদের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বীজনেস স্যান্ডার্ড পত্রিকা অনুযায়ী চলতি অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অন্যান্য সেক্টরে যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে তারাও ধর্মঘটীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে দিতে পারে এমন একটা আশঙ্কা বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান উড়িয়ে দিচ্ছে না। তাছাড়া এর ফলে মালক পক্ষ লোকসান করছে। বীজনেস স্যান্ডার্ড অনুযায়ী (১৬ ০২ ২০১০) ৬১ দিনের স্ট্রাইকে মোট ২২ বিলিয়ন টাকা (৪৭৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার) ক্ষতি হয়েছে।
কেন্দ্র ও বাম ফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকার সহ আন্যান্য পার্টি এবং ইউনিয়ন মিলিতভাবে ধর্মঘট দমনের কাজে হাত লাগায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
 দেখানোর জন্য সব রাজনৈতিক দলই ধর্মঘট সাপোর্ট করেছে(তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি বাদে); আর বাস্তবে তাদের নিজ নিজ ছাতার তলায় থাকা ইউনিয়নগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে যেমন করেই হোক শ্রমিকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে আনতে। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাদের দল সিপিএমের অধীন বেঙ্গল চটকল মজদুর সঙ্ঘের নেতা গোবিন্দ গুহকে পরামর্শ দিয়েছেন শ্রমিকদের সব দাবী দাওয়া মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা না করতে। মিস্টার গুহ সংবাদ মাধ্যমকে নিজেই জানিয়েছেন,
আমি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি; তিনি সব দাবী শুনেছেন; তিনি বলেছেন এইসব দাবী মেনে নিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়াটা খুব শক্ত হবে। উল্লেখ্য, সবচেয়ে বেশি সংখ্যার শ্রমিক সিপিএমের এই ইউনিয়নের সদস্য।
 শুধু পশ্চিমবাংলার প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস তার অধীন ট্রেড ইউনিয়নকে নির্দেশ দিয়েছে ধর্মঘটে যোগ না দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে। তৃণমূলের মতে কারখানা অচল করে দেয় এমন কোন কিছুতেই থাকা চলবে নাবড় বড় বীজনেস হাউজের পক্ষে এই অবস্থান যথেষ্ট সন্তোষজনক এবং এজন্য তৃণমূলের কর্মকান্ডে ওদের অর্থসাহায্য করার কথাও শোনা যাচ্ছে।
শ্রমিকদের এই লড়াকু মনোভাবকে বেপথু করছে ট্রেড ইউনিয়ন
অন্যান্য মিলগুলোর  শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার রাস্তাতেই হাঁটতে দেয় না ইউনিয়নগুলো; কলকাতার অন্যান্য নানা সেক্টরের শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার পথে তারা প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রমিকদের প্যাসিভ, পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে রেখে ইউনিয়ন নেতারা শুধু আশ্বস্ত করে যে কিছু করার দরকার নাই, অপেক্ষা কর, নেগোসিয়েসন হবে, মালিককে দাবী মানাতে বাধ্য করব। বাস্তবে, বকেয়া বেতন মেলে না, মজুরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুত পরিমানটাও নেহাতই সামান্য থেকে যায়। বলা হয়, বকেয়া বেতন কিস্তিতে বেশ কিছু মাস ধরে মেটানো হবে। ডিয়ারনেস আলাউয়েন্স টাও মাসিক মাইনের সঙ্গে দেওয়া হবে না, সেটাও হবে তিনমাস অন্তর। পরিবর্তে ইউনিয়ন কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে? পরবর্তী তিন বছর শ্রমিকেরা কোন ধর্মঘট করবে না!! সিপিএমের ইউনিয়ন নেতা মিস্টার গুহ বলছেন পরবর্তী তিন বছর চটকলে কোন ধর্মঘট হবে না। এথেকে মালিকেরা চটকল মজুরদের নিশ্চিন্ত মনে আক্রমন চালিয়ে যেতে পারবে: চাকরি ছাঁটাই, মজুরি সংকোচন হবে, প্রাপ্য মজুরি দিচ্ছে না, দেবেও না, লিভিং কনডিশন, ওয়ার্কিং কনডিশন আরো খারাপ হবে কিন্তু কিছু বলা যাবে না! এই হল ইউনিয়নের শ্রমিক দরদী ভূমিকা।
এই ভয়ংকর বেইমানি শ্রমিকদের সাথে করা হল: এই দীর্ঘ ধর্মঘটের সময় ধরে বেতন না পেয়েও ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ফল শ্রমিকেরা পেলেন। এক নিদারুণ হতাশা, যন্ত্রণা এবং ঘৃণা ও রাগের আগুন জ্বলতে থাকল শ্রমিকদের মনে।
এই তীব্র রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটল আকস্মিক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর ভেতর দিয়ে
ধর্মঘট শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মজুরদের ক্ষোভ ফেটে পড়ল ইউনিয়ন অফিসগুলো আর তার নেতাদের আক্রমণের ভেতর দিয়ে।
চৌঠা মার্চ ২০১০, উত্তর চব্বিশ পরগনার জগদ্দল জুট মিলের মজুরদের বিরুদ্ধে মালিকপক্ষ নতুন আক্রমণ নামিয়ে আনল। স্থায়ী মজুরদের করণীয় স্থানান্তরণের কাজটা চুক্তিভিত্তিক মজুরদের হাতে তুলে দিতে চেষ্টা করা হল। লোকাল ইউনিয়ন লিডারদের তোয়াক্কা না করেই, মজুরেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং এই্ পদক্ষেপ প্রতিহত করে। শ্রমিকদের এই প্রতিরোধ ভাঙতে এবং তাদের ভয় দেখাতে পরদিন মালিকেরা আকস্মিকভাবেই গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং সাসপেনসন নোটিশ দেয়। শ্রমিকেরা সকালের শিফটে কাজ করতে এসে দেখে এই অবস্থা।
দীর্ঘদিন ধর্মঘট করারর ফলে বেতন না পাওয়া, সবদিকথেকে অন্যায়ের শিকার হওয়া বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার শ্রমিক তৎক্ষণাৎ এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে: তারা শ্লোগান তোলে এখনি মিল খুলতে হবে এবং শ্রমিকদের কাজ করতে দিতে হবে।এই সময়েই ৫৬ বছর বয়েসী এক পুরোণো শ্রমিক আক্রমণের আকস্মিকতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং হার্ট আ্যাটাক হয়ে প্রায় তৎক্ষণাৎ মারা যান। এই ঘটনা শ্রমিকদের ভেতর রাগ ও ঘৃণার আগুন শতগুন বাড়িয়ে তোলে। তাঁরা বোঝেন যে এই সাসপেনশনের পেছনে অতি আবশ্যই ইউনিয়নগুলোর হাত আছে। ক্রুদ্ধ মজুরেরা সংগে সংগে (সরকারী বামপন্থী সিপিএম পরিচালিত) সিটু এবং (কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন কংগ্রেস পরিচালিত) আইএনটিইউসির অফিসে যান এবং অফিস ভেঙে তছনছ করেন।সিটুর লিডার ওমপ্রকাশ রাজবর মজুরদের হাতে মার খায়। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে ম্যানেজার এবং নেতাদের উদ্ধার করে। অবশ্যই পুলিশ শ্রমিকদের প্রতি ভায়োলেন্ট আচরণ করে, নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে সাধারণ মজুর ও তাদের ফ্যামিলির লোকজনদের।
এরকম হিংসাত্মক কার্যকলাপ অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে না, তবু এই ঘটনা দেখায় যে মালিক এবং ইউনিয়নের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মধ্যে কি তীব্র রাগ এবং ধিক্কার জমা হয়ে আছে!
কিভাবে এগোনো যায়
জুট শিল্প বরাবরই সমস্যাদীর্ণ আর বর্তমানে তীব্রতর হতে থাকা বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব থেকে অন্যান্য সেক্টরগুলোর মতই জুট শিল্পও মুক্ত থাকতে পারে না। লাভ বজায় রাখা শুধু নয়, মিল মালিকদের লক্ষ্য আরো বেশি বেশি লাভ করা। এর একমাত্র উপায় শ্রমিকদের আরো আরো বেশি শোষণ করা, আর এজন্যই, তাদের কাজের পরিস্থিতি, জীবনযাপনের মানের ওপর আরো ভয়াবহ আক্রমণ নামিয়ে আনা ছাড়া আর কোন উপায় আজ নেই। জুট ওয়ার্কারদের আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তাঁরা প্রায়শই জঙ্গী আন্দোলন করেছেন, বীরের মত রুখে দাঁড়িয়েছেন অন্যায় ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে তাঁদের স্বার্থে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অন্যান্য সেক্টরে, কলে কারখানায় শ্রমিকদের সংগ্রামগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে চলবে না, বরং আন্দোলনে পরস্পরের সাথী হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিকদের সাহায্য সহযোগিতা সমর্থন ছাড়া আজকের দিনে বিচ্ছিন্নভাবে একটা সেক্টরের মজুরের লড়াই জয়যুক্ত হতে পারেনা। পরন্তু, ইউনিয়নের বিরোধীতা করতে গিয়ে হয় নিষ্ক্রিয় থাকা নয়তো এধরণের নৈরাজ্যমূলক ভায়োলেন্ট ঘটনা ঘটানো কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়। ইউনিয়ন  মালিক ও রাষ্ট্রের পক্ষেই থাকতে বাধ্য, এথেকে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষার কোন সম্ভাবনাই নেই, এই ব্যাপারটা শ্রমিককে বুঝতে হবে এবং সমস্ত ধরণের ইউনিয়নসংগঠনের খপ্পর থেকে বাইরে এসে নিজেদের আন্দোলন নিজেদের হাতেই নিতে হবে। স্বসংগঠন গড়ে তোলা,আন্দোলনের পন্থা পদ্ধতি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের সাধারণ সভা আয়োজন করা, স্থায়ী নেতৃত্বের বদলে যেকোন সময়ে প্রত্যাহারযোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্যান্য কলে কারখানায় অফিসে আন্দোলনের সমর্থনে শ্রমিকভাইবোনেদের আহ্বান করা ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই আজকের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।
নিরো,২রা মে ২০১০

‘ব্যয়সংকোচের দাওয়াই’-এর বিরুদ্ধে: শ্রেনিসংগ্রাম!

এই মুহূর্তে ভীষণ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে গ্রীসের পরিস্থিতি। যেকোন মুহূর্তে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে শ্রমিক শ্রেণি। গ্রীক রাষ্ট্র শ্রমিক শ্রেণির ওপর অবিরাম আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেসমস্ত প্রজন্মের, সমস্ত সেক্টরের ওয়ার্কার আজ সেই আক্রমণের শিকার। প্রাইভেট সেক্টর, পাবলিক সেক্টর, বেকার, পেনসনজীবি, আংশিক সময়ের চুক্তিতে কর্মরত ছাত্র-ছাত্রী কেউ বাদ যায়নি। সমগ্র শ্রমিক শ্রেণি নিদারুণ দারিদ্রের মুখোমুখি।রাষ্ট্রের আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রমিকশ্রেণি তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। অন্যান্য কান্ট্রিগুলোর মতই গ্রীসেও শ্রমিকশ্রেণি নেমেছে রাস্তায়, করছে ধর্মঘট,জানিয়ে দিচ্ছে:

পুঁজিবাদের সংকটে তারা আর বলির পাঁঠা হতে চায় না; পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিদারুণ আত্মত্যাগের আহ্বানে  সাড়া দিতে শ্রমিকশ্রেণি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধ নয়।

তবে গ্রীসে এই আন্দোলন এখনও বিশাল আকার ধারণ করেনি। গ্রীসের শ্রমিকেরা এই মুহূর্তে অত্যন্ত কঠিন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত মিডিয়া এবং সমস্ত রাজনীতিকরা শ্রমিকশ্রেণিকে জ্ঞান দিচ্ছে : বাছা করার আর কিছু নেই কোমরে গামছা বাঁধ কষে আর দেউলে অবস্থা থেকে দেশটাকে বাঁচাও; তো তখন শ্রমিকেরা কী করবে? শ্রমিক ভাইয়েরা ভীষণ দানবাকৃতি এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিভাবে দাঁড়াবে? কিভাবে কোন্‌ পদ্ধতিতে লড়াই করা দরকার যাতে শক্তিসাম্যটা শোষিত মানুষের পক্ষে আসে?

এই সব প্রশ্ন শুধু গ্রীসের শ্রমিকেরা ফেস করছেন তা নয়, এ প্রশ্ন আজ সমগ্র বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণির। প্রকৃতপক্ষে গ্রীসের এই ট্র্যাজেডিসারা বিশ্বে কী ঘটতে চলেছে তার আভাস মাত্র। ইতোমধ্যে গ্রীক স্টাইলে ব্যয়সংকোচের প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে পর্তুগাল, রুমানিয়া, জাপান এবং স্পেন (যেখানে সরকার পাবলিক সেক্টরের ওয়ার্কারদের বেতনের শতকরা ৫ ভাগ কেটে নিচ্ছে)। বৃটেনে এই কাটাউতি কিরকম হতে চলেছে তার ছবি নতুন কোয়ালিসন সরকার সবেমাত্র প্রকাশ করতে শুরু করেছে। এইসব আক্রমণ পরপর ঘটে চলেছে। এ থেকে আবারো বোঝা যাচ্ছে শ্রমিকশ্রেণির কোন জাতীয়তা নেই, পৃথিবীজুড়ে তাদের একটাই শ্রেণি পরিচয়, তাদের স্বার্থও একটাই, এই ধরণীতে তাদের শত্রুও একটাই। পুঁজিবাদ প্রলেতারিয়েতকে মজুরি-শ্রমের এই ভারী শেকলটা পরে থাকতে বাধ্য করে, তবে একইসঙ্গে এই শেকলই বিশ্বজুড়ে তাদের যুক্তও করে, একত্র করে সারা বিশ্বের শেকলপরা প্রলেতারিয়েতকে।

গ্রীসে আমাদেরই শ্রেণিভাইবোনেরা আক্রমণের শিকার আর তারাই এই আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে নেমেছে তাই তাদের সংগ্রাম আমাদেরই সংগ্রাম।

গ্রীসের শ্রমিকশ্রেণির প্রতি আমাদের সংহতি জানাই! একটাই শ্রেণি আমাদের, লড়াইও আমাদের একটাই!

বুরজোয়ারা আমাদের মধ্যে হাজারোরকমের বিভেদ সৃষ্টির চক্রান্ত অনবরত চালিয়ে যাচ্ছে--এই সমস্ত চক্রান্ত আমাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সেই আদ্যিকাল হতে চলে আসা শাসকশ্রেণির নীতি: ভাগ কর শাসন কর’—এর বিরুদ্ধে আমাদের শ্লোগান আজ একটাই: দুনিয়ার মজদুর এক হও।

ইউরোপে, বিভিন্ন দেশীয় বুরজোয়ারা বলছে আমাদেরকে যদি পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকতে হয় তো তার দায় গ্রীসের। সেখানে দেশ পরিচালনার দায় যাদের কাঁধে তারা অসততা করেছেদশকের পর দশক তারা দেশটাকে ঋণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে দিয়েছে, সরকারী অর্থের অপব্যয়, তছরুপ এবং লুটপাট করেছে আর এরাই ইউরোর প্রতি বিশ্বজোড়া আস্থার যে সংকট তার জন্য দায়ী। একটার পর একটা, এইসব ফালতু অজুহাত দেখিয়ে সরকারগুলো কেন ডেফিসিট কমাতে হবে তার ব্যাখ্যা দিচ্ছে আর আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে ব্যয় সংকোচেরর কঠোর পদক্ষেপগুলো।

গ্রীসে সমস্ত সরকারী পার্টিগুলো জাতীয়তাবাদের পালে হাওয়া দিচ্ছে; এদের পুরোভাগে আছে গ্রীসের কম্যুনিস্ট পার্টি; এরা দোষ চাপাচ্ছে বিদেশী শক্তির ওপর। বাম আর অতিবামদের মিছিলে কান পাতুন, শুনতে পাবেন: আই.এম.এফ. আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নিপাত যাককানে আসবে জার্মান নিপাত যাকএই শ্লোগান। গ্রীসের জাতীয় পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য এরা যথাসাধ্যই করছে।

 বুরজোয়াদের কোন কোন গোষ্ঠী বলছে ইউএস-এতে স্টক মার্কেটে ধস নামার কারণ হল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্থির অবস্থা। কোম্পানীগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ ইউরো কারেন্সির দুর্বল অবস্থা কেননা, ডলার এবং ইউএসের রপ্তানীর ক্ষেত্রে ইউরো একটা প্রতিবন্ধক।....

সংক্ষেপে, প্রতিটা জাতীয় বুরজোয়া তাদের প্রতিবেশী বুরোজোয়া দেশগুলোকে অভিযুক্ত করছে আর শ্রমিকশ্রেণিকে ব্ল্যাকমেল করছে। এরা বলছে: ব্যয়সংকোচ মেনে নাও নয়তো দেশ দুর্বল হয়ে পড়বে আর এর সুফল ভোগ করবে আমাদের প্রতিযোগী অন্য দেশগুলো। এভাবে জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত ইনজেকসন দিয়ে এরা আমাদের শ্রেণি সংগ্রামের রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে।

কতকগুলো প্রতিযোগী পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে বিভাজিত ধরণী আমাদের ধরণী নয়। যে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বাস করছি সেই রাষ্ট্রীয় পুঁজির স্বার্থে শৃঙ্খলিত থেকে শ্রমিকশ্রেণির কিচ্ছু পাবার নেই। আজ জাতীয় অর্থনীতিকে বাঁচাবার স্বার্থে ওদের চাপিয়ে দেওয়া ব্যয়সংকোচের কালা কানুন মেনে নেওয়ার মানে আগামীকাল আরও কঠোরতর আত্মত্যাগ মেনে নিতে প্রস্তুত থাকা।

গ্রীস আজ গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। আজ স্পেন, ইতালি এবং পর্তুগাল ঠিক তার পিছনের সারিতে; বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, আমেরিকা আজ ভীষণ এক সংকটের মুখোমুখি--- এসবের কারণ পুঁজিবাদ এখন আক্ষরিক অর্থেই মুমূর্ষ ব্যবস্থা। পুঁজিবাদের নৈরাজ্যের অতল তলে ক্রমাগত আরো তলিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দেশ। গত চল্লিশটা বছর ধরে পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি সংকটাপন্ন। এক মন্দা থেকে আরেক মন্দার ভেতর দিয়ে চলেছে সে।  এ্যাদ্দিন শুধুমাত্র বাঁচার চেষ্টায় মরীয়া পুঁজিবাদ লাগামছাড়াভাবে ঋণের আশ্রয় নিয়েই যেটুকু সম্ভব বিকাশটুকুকে জিইয়ে রাখতে পেরেছে; কিন্তু তার ফলাফল আজ কী? প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিটি পরিবার, কোম্পানী, ব্যাঙ্ক আর রাষ্ট্র সমস্তটাই ঋণভারে জর্জরিত। গ্রীস রাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে যাওয়াটা এই শোষণভিত্তিক ব্যবস্থাটার সাধারণ এবং ঐতিহাসিকভাবে দেউলে অবস্থারই একটা বিশেষ বিকৃত প্রকাশমাত্র।

শাসকশ্রেণির দরকার আমাদের ঐক্য ভাঙা: আমাদের দরকার শ্রেণি-সংহতি!

শ্রমিকশ্রেণির শক্তি তার ঐক্য!

শাসকশ্রেণি ব্যয়সংকোচের যে প্ল্যান ঘোষণা করেছে তা আসলে আমাদের জীবনযাপনের অবস্থার ওপর সামগ্রিক একটা আক্রমণ। সুতরাং এর বিরুদ্ধে একমাত্র দাওয়াই শ্রমিকশ্রেণির ব্যাপক শ্রেণি-সংগ্রাম। নিজের ছোট্ট চৌহদ্দির ভেতর লড়াই করে একে ঠেকানো অসম্ভব: তা সে নিজ নিজ ফ্যাক্টরি, স্কুল, অফিস যাই হোক; একাএকা এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন থেকে কোন আন্দোলনই আজ আর এই বিপুল আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারবে না। সুতরাং সমস্ত ক্ষেত্রের সমস্ত শ্রমিকের ব্যাপক আন্দোলন আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।  শাসকেরা সেক্টরভিত্তিক লড়াই চূর্ণ করে দেবেই, আর বাধ্য করবে গভীরতর দারিদ্রে নিমজ্জিত হতে। এর বিপরীতে একমাত্র উপায় সমস্ত বিভাজনরেখার ভেঙে চূড়মার করে সমস্ত সেক্টরের শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহত লড়াই। 

লক্ষ্য করুন অফিসিয়াল সংগ্রাম-বিশেষজ্ঞদের মানে ট্রেডইউনিয়নওয়ালাদেরকী করছে তারা? অসংখ্য কর্মক্ষেত্রে তারা ধর্মঘট সংগঠিত করছে:কিন্তু একটিবারের জন্যও তাদের চেষ্টা নেই এই সমস্ত পৃথক পৃথক আন্দোলনগুলোকে একসূত্রে গাঁথার। বরং সেকসনগত, বিশেতঃ সরকারী এবং বেসরকারী ক্ষেত্রগুলোর শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজনটাকে এরা সক্রিয়ভাবে উৎসাহিতই করছে। তারা শ্রমিকদের নিষ্ফল, নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদ-কর্মসূচীতে সামিল করছে; সোজা কথায় তারা ওয়ার্কারদের ঐক্য বিনাশ করারই বিশেষজ্ঞ। ইউনিয়নগুলোও একইরকমভাবে জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে আরো চাঙ্গা করতে চাইছে। একটা উদাহরণ দিই: মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউনিয়নগুলোর একটা গালভরা কমন্‌ শ্লোগান হল: স্বদেশী জিনিস কেনো!

ইউনিয়নের রাস্তায় হাঁটা মানে ঐক্যের বিপরীতে হাঁটা, পরাজয়ের পথে হাঁটা। শ্রমিকদের নিজেদের সংগ্রাম নিজেদের হাতেই নিতে হবে; সব শ্রমিকদের সম্মিলিত সাধারণ সভায় নিজেদের সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে, সাধারণ সভায় সংগ্রামের দিশামুখ, পদ্ধতি ইত্যাদি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভেতর দিয়ে, নিজেদের দাবী আর শ্লোগান সম্মিলিতভাবে ঠিক করার মধ্যে দিয়ে, সংগ্রাম পরিচালনার জন্য, যেকোন সময়ে প্রত্যাহারযোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে, সংগ্রাম কমিটি গঠন করে, কাছাকাছি থাকা ফ্যাক্টরি, স্কুল. কলেজ. হাসপাতালইত্যাদি সম্ভাব্য সব জায়গায়কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে (যাতে তারাও আন্দোলনে সামিল হয় সেই্ লক্ষ্যে) আলোচনা করার জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর কাজ সংগঠিত করার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণিকে একাজ করতে হবে।

ট্রেডইউনিয়ন চৌহদ্দির বাইরে বেরিয়ে, শ্রেণি তার নিজের সংগ্রামের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে নিজেই, অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিকের কাছে যাবে—এগুলো বেশ কঠিন কাজ মনে হতে পারে। আসলে শ্রমিকশ্রেণির নিজ শ্রেণির প্রতি গভীর আস্থার অভাব আজকের দিনে শ্রেণিসংগ্রাম বিকাশের ক্ষেত্রে একটা বিরাট বাধা। নিজের শ্রেণিটা যে কি বিপুল শক্তি ধরে সেটা সম্বন্ধে তারা নিজেরা পুরোপুরি সচেতন নয়। এই মুহূর্তে একদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, পুঁজিবাদের হিংস্র আক্রমণ, অন্যদিকে প্রলেতারিয়েতের স্ব-শ্রেণির প্রতি দৃঢ় আস্থার অভাব সব মিলে একটা অচল, অবশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যেমনটা দাবী করে এমনকি গ্রীসেও, শ্রমিকের সাড়া, তার তুলনায় অনেকটাই ক্ষীণ। তাসত্বেও ভবিষ্যৎ শ্রেণিসংগ্রামেরই হাতে। পুঁজিবাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির ক্রমবর্ধমান এবং ব্যাপক আন্দোলনই সামনে এগোনোর একমাত্র রাস্তা।

কিছু মানুষ জিগ্যেস করছেন, “ কেন আন্দোলন করব? এ আন্দোলনের পরিণতিটাই বা কী? পুঁজিবাদ তো দেউলে হয়ে গেছে, কোন সংস্কারই যখন সম্ভব নয়, তখন আর কিইবা রাস্তা থাকে?” সত্যি বলতে কি, এই শোষণভিত্তিক ব্যবস্থার ভেতর আর কোন সমাধান নেই। কিন্তু কুত্তার মত বাঁচতে অস্বীকার ক’রে সম্মিলিতভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মানে আপন মর্যাদা রাখার দাঁড়ানো। এর মানে এই উপলব্ধি যে এই প্রতিযোগিতা আর শোষণ ভিত্তিক বিশ্বেও সংহতি নিশ্চিতভাবেই আছে আর এই অমূল্যবান মানবিক অনুভবটিকে বিশ্বজুড়ে বাস্তবায়িত করতে শ্রমিকশ্রেণি সক্ষম। আর এখান থেকেই আরেক নতুন ধরণীর অভ্যুদয়ের শুরু: একটা বিশ্ব যেখানে কোন শোষণ নেই, রাষ্ট্রীয় সীমানা নেই, নেই কোন সেনাবাহিনী; সে বিশ্ব লাভের জন্য নয়, মানুষের জন্য। শ্রমিকশ্রেণি নিজের শক্তির ওপর গভীর আস্থা গড়ে তুলতে পারে এবং তা তাকে করতেই হবে। একমাত্র এই আস্থাই সেই মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে সক্ষম; এই আস্থাই   মার্কসের ভাষায় “পরিস্থিতির দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার পরিমন্ডলে উত্তরণের” মধ্যে দিয়ে মানুষের প্রজাতিগত সত্তার প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে পারে।

পুঁজিবাদ দেউলিয়া কিন্তু আরেক বিশ্ব সম্ভব, সে হল কমিউনিজ্‌ম্‌!

ইন্টারন্যাশানাল কমিউনিস্ট কারেন্ট, ২৪শে মে ২০১০

Communist Internationalist - 2011

ওবামা প্রশাসনের বিদেশনীতি - বন্ধুত্বের মুষ্টি‍ ! (Obama Administration's Foreign Policy—the fist of friendship)

 আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ বর্তমানে শত্রুদেশএবং তথাকথিত মিত্রদেশ উভয়দিক থেকেই একইরকমভাবে সমস্যায় জর্জরিত। বুশ প্রশাসনের একলা চলো নীতির পরবর্‍তী পর্ষায়ে ওবামা নির্বাচিত হওয়ায় ধরে নেওয়া হয়েছিল যে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে তার অভিযানের কলাকৌশলের ভিত আরো মজবুত করতে কিছুটা বিলম্ব করার নীতিই নেবে। ওবামার শান্তিকামী ইমেজ এবং তার প্রশাসনের সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের দৃষ্টিভঙ্গী আর কূটনৈতিক প্রকৌশলগুলি আসলে ছিল দ্বিতীয় সারির প্রধান শক্তিগুলিকে নিজের মিলিটারী শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে শত্রুদেশগুলিকে প্রতিহত করার পদক্ষেপমাত্র। ইন্টারন্যাশনাল রিভিউয়ের ১৩৮ নং সংখ্যায় বলা হচ্ছে, আমেরিকার মূল লক্ষ্যটি আসলে মিলিটারি শক্তির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করা। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উত্তরোত্তর কূটনৈতিক সম্পর্‍ক স্থাপনের জন্য ওবামার বন্ধুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলি তাৎপর্ষপূর্ণভাবে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিলম্বের লক্ষ্যেই পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে আগামীদিনে যে কারোর যে কোন বিষয়ে অনিবার্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা যায়। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী প্রয়োজনেই আমেরিকাকে বিভিন্ন দেশে তার সামরিক বাহিনীকে ছড়িয়ে রাখতে হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ করতে করতে তার বাহিনী এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে তার পক্ষে এখনই আর কোন নতুন যুদ্ধে লড়া সম্ভব নয়। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা, সহযোগিতা ও কূটনৈতিক পদ্ধতির উপর তাই   ঢাকঢোল বাজিয়ে খুব জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ওবামার এসব গালভরা বুলি ও নীতি আরো বেশি বেশি করে বুশ প্রশাসনের নীতির মতোই হয়ে উঠছে। বরং সেগুলিকে আরো ক্ষুরধার, আরো কার্ষকরী ও আরো ব্যাপক করে তোলা হয়েছে যাতে বর্তমানের  উত্তরোত্তর উত্তেজিত পরিস্থিতিকে  সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়।

যদি কোন ঘটনা এই নীতিগুলির আসল উদ্দেশ্য প্রমান বা স্পষ্ট করতে পারে তবে তা হলো হাইতিতে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পরেই আমেরিকার হাইতি আগ্রাসন। যেখানে আমেরিকার পেছনে লাগা সবকটি দেশের সরকার এবং তাদের এজেন্টদের ছাপিয়ে আমেরিকা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই ঘটনা বিশ্বের তাবৎ শক্তিগুলির প্রতি আমেরিকার পাঠানো এক ভয়াবহ বার্তা।
ইরাকে সেনা প্রত্যাহার স্থগিত রাখা এবং আফগানিস্তানে আরও ত্রিশ হাজার সেনা মোতায়েন ছাড়াও আরো অনেক ঘটনা আছে যেগুলি আমেরিকার আধিপত্য আরো বেশি মজবুত করার প্রয়োজনীয়তা ও তার উপলব্ধিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ওবামার নীতিগুলি, যেগুলিকে বুশের একপেশে নীতি থেকে আলাদা বলে দাবী করা হচ্ছে সেগুলি হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। A Blueprint For Pursuing The World We Seek”-নাম দিয়ে ঐ নীতিগুলির ব্যাখ্যা আরম্ভ হয়েছে ওবামারই  উক্তি দিয়ে- অন্যদের মধ্যে ভয় ধরানোর ক্ষমতা দিয়ে আমাদের দীর্‍ঘমেয়াদী নিরাপত্তা আসবে না; সেটা আসবে অন্যদের আশা-আকাঙ্খাগুলি পূরণ করার মাধ্যমে। এহেন বক্তব্যের সার কথাটি হলো চীন, ভারত এবং রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্‍ক স্থাপন করা। কিন্তু রিপোর্টে আবার সাইবার অপরাধের মতো বিষয়টির ওপর দারুন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এইটা  চীন একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। সম্প্রতি আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্‍কের ব্যাপারে ভারতকে আমেরিকা রীতিমতো কড়াভাবে সমালোচনা করেছে। এর ফলে উল্টো ফলই ফলেছে। ভারতীয় বুর্জোয়ামহল চটে গিয়ে সান্ত্বনা খুঁজতে রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। আবার ককেশাস অঞ্চলে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে তীব্র উত্তেজনা রয়েছে। কিরঘিজস্তানে চুড়ান্ত অস্থিরতার সময় যখন সরকারের পতন ঘটে তখন সেখানে দুইপক্ষই তীব্রভাবে জ্বলে ওঠে। এই কিরঘিজস্তানে দুইপক্ষেরই বিমানঘাঁটিও রয়েছে।
বুশ জমানার নীতিগুলির সাথে মূলগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই, ওবামার এই রিপোর্টেও আমেরিকার একতরফা বসিজ্‌ম চালিয়ে যাবার অধিকার কায়েম রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে যে কাউকে আগেভাগে আক্রমণ করার বিধ্বংসী নীতিকেও বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎআমেরিকা সর্বত্র সামরিক প্রভুত্ব বজায় রাখবে এবং এজন্যই সবার গণতান্ত্রিক ও মানবিক(!) অধিকার প্রতিষ্ঠার বাণী আউড়ে যাবে।
 আসলে এই বাণী চীন, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে দেখে নেবার ইঙ্গিত। এই নীতিগুলি বুশের সেই পুরনো নীতিগুলি অবশ্য নয়, বরং পরিবর্তিত অস্থির পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য পুরনো নীতিগুলিরই পরিশোধিত রূপ। এই নীতিরই ছত্রছায়ায় গত বছরের শেষে আমেরিকার Central Command-এর প্রধান জেনারেল পেট্রিয়াস একটি আদেশে সই করেন যাতে আরো নিবিড়ভাবে , ব্যাপকতরমাত্রায় অন্যদের বিরুদ্ধে গোপন আক্রমন চালানো যায়। এসবের বিশদ তথ্য অবশ্য পাওয়া যাবেনা। তবে ২৫শে মে, ২০১০ তারিখের দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা হয়েছে- আমেরিকান সৈন্যরা বর্তমানে ইরান, ইয়েমেন, সিবিয়া, সোমালিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় রয়েছে। ইরান স্পষ্টতঃ অভিযোগ জানিয়েছে যে ঐ এলাকায় অস্থিরতা উস্কে দেবার জন্য আমেরিকা ও ব্রিটেন বিশেষ বাহিনী পাঠাচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ৫ই জুন, ২০১০ তারিখে জানাচ্ছে যে বর্তমানে ৭৫টি দেশে আমেরিকান সৈন্য নিয়োজিত রয়েছে।অথচ গত বছর ওবামা যখন দায়িত্বে আসেন তখন ৬০টি দেশে আমেরিকান সৈন্য সক্রিয় ছিল। বিশেষ অভিযানের জন্য ওবামা বাজেট বৃদ্ধি করেছেন এবং সেনাকর্তারা হোয়াইট হাউসে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশী হাজিরা দিচ্ছেন।জনৈক অফিসার জানাচ্ছেন, এই সেনাকর্তারা এখন কথা কম বলে কাজ বেশি করছেন। আর এই উদ্দেশ্যেও লোহিত সাগর, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ভারত মহাসাগরের কোথাও কোথাও ব্যাপকভাবে সেনাশক্তি ও ঘাটি এলাকা বাড়িয়ে আমেরিকার ৫ম নৌবহরের অবস্থান ও অভিযানের ক্ষেত্রকে আরো সুরক্ষিত করার কাজ সবে শুরু হয়েছে।                                  
কূটনীতিযুদ্ধের অন্যরূপ(Diplomacy as war)
র‍্যামসফেল্ডের পদাঙ্ক অনুসরণ ক'রে গোপন অভিযানগুলিকে প্রকাশিত গোপন অভিযানে রূপান্তর করাটা আসলে শত্রুদেশগুলির প্রতি আমেরিকার যুদ্ধঘোষনারই অংশ এবং মিত্রদেশগুলির প্রতি তা সতর্কবার্তাও বটে। আমেরিকার প্রশাসন খোলাখুলিই এটা বলেছে।এই একই পদ্ধতিতে ওবামা প্রশাসন কূটনীতিকেও ব্যবহার করছে। এই কূটনীতি আসলে যুদ্ধের একটা দিক, সাম্রাজ্যবাদের একটা দিক। বিপুল জনমতে নির্বাচিত জাপানের প্রধানমন্ত্রী যখন কাঁধ থেকে আমেরিকার জোঁয়াল নামিয়ে জাপানের জন্য আরো স্বাধীনভাবে চলাফেরার প্রস্তাব দিলেন, জাপানে আমেরিকার বিমানঘাঁটি বন্ধের কথা বললেন, তখন আমেরিকান প্রশাসন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাল- বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ক'রে তোলার বিষয়ে। জাপানী প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতিয়াসকে ওয়াশিংটন সফরকালে জনসমক্ষে হেয় করা হয়। সংবাদপত্রের খবর ওবামা তাঁকে নাকি বলেছেন, তুমি সময়ের আগে দৌড়াতে চাইছ( সোজা কথায় ক্ষমতার বাইরে গিয়েনিজের মতো চলতে চাইছ)। আমেরিকার কূটনৈতিক দাপটে, গালিগালাজপূর্ণ অপমানে আর জাপানসহ এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে হাতিয়াস একদম চুপসে যান এবং ক্ষমা চেয়ে পুরনো পথে ফিরে আসেন। গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মহিমা তাহলে বোঝাই গেল।
জাপানের মতোই অবস্থা হয় ব্রাজিল ও তুরস্কের। ইরানের ইউরেনিয়াম তুরস্কে আনার জন্য ইরানের সঙ্গে তাদের যে চুক্তি হয় তার জন্য তাদের তীব্র সমালোচনা করে আমেরিকা। অথচ চুক্তিটি UN-এর সংশ্লিষ্ট খসড়া পরিকল্পনা মেনেই হয়েছিল এবং ঐ খসড়া পরিকল্পনাটি মেনে নেওয়ার জন্য আমেরিকা ও তার অনুরাগীরা বারেবারেই ইরানকে অনুরোধ করেছিল। আন্তর্জাতিক  সহযোগিতার হাত বলতে কি তাহলে এটাই বোঝায়? ব্রাজিল ও তুরস্ককে এই যে বাধা দেওয়া হল তার পিছনে কারণটি কী? কারণটি হলো ব্রাজিল ও তুরস্ক দুটি দেশই ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত UN প্যাকেজের বিরোধিতা করেছিল যে প্যাকেজটি রূপায়িত করতে আমেরিকা পাঁচমাস ধরে চেষ্টা করছিল। ঐ প্যাকেজটিতে কী আছে? আছে অর্থনৈতিক অবরোধ, অস্ত্র সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, এবং UN-এর সদস্যদের প্রতি ইরানের কাজকর্মের দিকে নজর রাখার জন্য সতর্কবার্তা; ইরানের  জাতীয় জাহাজ নির্মাণ কারখানা, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ বিপ্লবী প্রহরীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য বস্তুগুলিকে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীকেও আক্রমণের নিশানা করা হয়। এছাড়াও আমেরিকাকে সাহায্য করতে ইউরোপীয় শক্তিগুলির আরো বেশী অনুদান এবং মিলিটারী শক্তি না দেওয়ার জন্য, আমেরিকাকে আরো   বেশী সমর্‍থন না করার জন্য ইউরোপের দেশগুলিকে কূটনৈতিক রাস্তায় যথেচ্ছ অপমানজনক সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সেই সাহায্যের খুব বেশি আশা নেই কেননা এরা সবাই একে অন্যের ঘাড় মটকাবার চেষ্টা করছে।
 
সমস্যা,সমস্যা  আর সমস্যা (Trouble, trouble and trouble)
আফগানিস্তান, ইরাক এবং পাকিস্তানে যুদ্ধ ছাড়াও ইরান, তুরস্ক এবং ইজরায়েল নিয়েও সমস্যা বেড়েই চলেছে। ১৯৮৯-তে রাশিয়ান ব্লকের পতনের পর একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের সঙ্গে কলহ সম্ভবতঃ সবচাইতে শঙ্কাজনক। অধিকৃত অঞ্চলে নতুন ক'রে ইহুদি বসতি না গড়ার জন্য আমেরিকার পরামর্শ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পর তথাকথিত 'গাজার জন্য সাহায্যসামগ্রী' বহনকারী মাভি মামারা জাহাজে ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর আক্রমণ ও হত্যাকান্ডের ফলে আমেরিকা ইজরায়েলী সম্পর্কের মধ্যে আরও অবনতি ঘটেছে। প্রচলিত পদ্ধতি না মেনে আমেরিকান কূটনীতি এটা দেখাতে চেয়েছিল যে আমেরিকা 'ছয় জাহাজের ঐ কনভয়ের ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য' ইজরায়েলকে সতর্ক ক'রে দিয়েছিল (দি অবজার্ভার,০৭.০৬ ১০)। আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলা হয়েছিল " আমরা এব্যাপারে ইজরায়েলের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছি; আমরা সতর্কতা ও সংযত আচরণের ওপর জোর দিয়েছি।" আমেরিকান কূটনীতি এটা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল যে ছয় জাহাজের ঐ কনভয়টিতে আক্রমণ না করতে তারা ইজরায়েলের সঙ্গে বারেবারে যোগাযোগও করতে চেষ্টা করেছিল। তাদের কথায়, আমরা জাহাজটির ব্যাপারে ইজরায়েলের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছিলাম এবং তাদের সংযত ও সতর্ক হতে বলেছিলাম। ইজরায়েলে আমেরিকার একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (৫ই জুন ২০১০ 'ওয়াসিংটন পোস্ট')'র মতে, ইজরায়েল আমেরিকার এমন একটি মিত্র যে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে হাঁটছে। এইভাবে তুরস্কও মনে হয় সাধারণভাবে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষক'রে বেশি বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা লাগামছাড়া সাম্রাজ্যবাদী হুটোপুটির ঐ এলাকায় আমেরিকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো সংহত করছে। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের তুরস্ক তার এলাকার মধ্যে যাতায়াত করতে না দিয়ে ইরান ও সিরিয়ার তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীনপথে চলার ক্ষমতা প্রদর্শণ করছে। প্যালেস্টাইনের প্রতি সহানুভূতিশীল দুনিয়ায় তুর্কি এখন একটা ঠতি শক্তিধর রাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের চেষ্টা ক'রে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে আর তাই আমেরিকান দাদাগিরি ও দালালির ফলে তৈরি তুর্কি-ইজরায়েল মিত্রতা সম্পর্কেরও সলিল সমাধি ঘটার সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে, বিশেষত:   মাভি মামারা জাহাজে কিছু তুর্কি নাগরিকের মৃত্যুর পর ব্যাপারটা তেমনই দেখাচ্ছে।
 
এছাড়াও রয়েছে আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চল ও আশেপাশের 'সঙ্কটাকীর্ণ' পরিস্থিতি। পৃথিবীর চরম উত্তপ্ত ও বিষ্ফোরক এলাকাগুলোর অন্যতম একটি হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। ইথিওপিয়ান মিলিটারি শক্তিকে চাঙ্গা ক'রে তোলার বৃটিশ-আমেরিকান সক্রিয়তা তাদেরই বিপদ বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে সমগ্র এলাকাটি অস্থির হয়ে রয়েছে আর আল কায়দা ও অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ইথিওপিয়া, ইরিট্রিয়া, সুদান ও সোমালিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো পুরোমাত্রায় এগুলোর সুযোগ নিয়ে নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরের অন্যদিকে য়েমেন আমেরিকার কাছে বেশি বেশি ক'রে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত হয়ে উঠছে।ইয়েমেনের ব্যাপারেআমেরিকা ও বৃটেনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটাকীর্ণ ক'রে তুলছে; এটাই হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্ম ও বেড়ে ওঠার উর্বরা জমি। এইসব গোষ্ঠী আফ্রিকার হর্ণ অঞ্চল, উত্তর কেনিয়া, উপসাগরীয় এলাকা এবং সৌদি আরবেও সন্ত্রাসবাদী ক্রিয়াকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত এলাকার পরিস্থিতিএতটাই বিশৃঙখল হয়ে উঠেছে যে আমেরিকান বড়দার পক্ষেও তা নিয়ন্ত্রণ করা মুসকিল হয়ে পড়ছে।   
 
এসব সমস্যা ছাড়াও আরও সমস্যা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি রণতরী উত্তর কোরিয়া সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবার ছোট ছোট শক্তিগুলিও আমেরিকান ধর্মবাপকে কোণঠাসা করতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। আমেরিকার 'সহযোগীরা'ও আর ততটা বিশ্বাসযোগ্য থাকতে পারবেনা কারণ তারাও তাদের নিজস্ব স্বার্থ নিয়েই মশগুল থাকবে। ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাতের এই পুরোপুরি অযৌক্তিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নানারকম ঘটনা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং আমেরিকার দুশ্চিন্তাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। একটা বিষয় নিশ্চিত যে আমেরিকা 'শান্তি ও সুসম্পর্ক স্থাপনের' বুলিলে এর মোকাবিলা করতে পারবেনা বা ওবামা যে মানবিকতার ভাবমূর্তি দেখাতে তৎপর তার মুখোশও খুলে যাবে। আমেরিকা পাশবিক সামরিক শক্তি ও যুদ্ধ দিয়েই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বাধ্য হবে আর পরিস্থিতিকে করে তুলবে আরো বিপজ্জনক; বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদীদ্বন্দ্ব সংঘাত ব্যাপকতর ও তীব্রতর হয়ে উঠবে।
বেবুন(Baboon),০৯.০৬২০১০
ওয়ার্ল্ড রিভোল্যুশন, সংখ্যা ৩৩৫

কমনওয়েলথ গেমস ও শ্রমিক-শোষণের তীব্রতার নগ্নরূপ

কমনওয়েলথ গেমস ক্রীড়াঙ্গনে খেলোয়াড়দের থাকার ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক স্ক্যাণ্ডাল ছড়িয়েছে। প্রখ্যাত অ্যাথলিটদের নাম প্রত্যাহার করা, বিভিন্ন দলের পৌঁছতে দেরী করা কিম্বা গেমস ভিলেজ উপযুক্ত মানে না আসা পর্যন্ত বিভিন্ন দলের হোটেলে অপেক্ষা করতে বাধ্য হওয়া ইত্যাদি নানা কেচ্ছা শোনা গেল। কমনওয়েলথ গেমসের মর্যাদালে আর কিছু থাকল না।

কিন্তু নির্মাণ ক্ষেত্রের স্ক্যাণ্ডালের বিচারে অর্থাৎ যে শোচনীয় অবস্থার মধ্যে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়েছে তার তুলনায় এইসব স্ক্যাণ্ডাল একদম তুচ্ছই বলা চলে।

বিভিন্ন দুর্ঘটনায় গেমস ভিলেজে ৭০ জন এবং দিল্লি মেট্রো নির্মাণে ১০৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।কিন্তু বহু শ্রমিক নথিভুক্ত না হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যাটি ঠিক কত তা কেউই বলতে পারবেনা। তবে এটা মোটেই আশ্চর্যজনক কিছু নয় কেননা, শ্রমিকদের প্রায়শঃ প্রয়োজনীয় হেলমেট, গ্লাভস, মুখোশ ইত্যাদি প্রাথমিক সাবধানতা ছাড়াই কাজ করতে হয়েছে। যদি শ্রমিকদের জুতো দেওয়া হয়েছে তাহলে তার জন্য তাদের মজুরী থেকে তার দাম কেটে নেওয়া হয়েছে। প্রায় সব সাইট থেকেই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। কিণ্তু সেগুলি খুব কম ক্ষেত্রেই কমিশনারকে রিপোর্ট করা হয়েছে। শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, ক্ষতিপূরণের আইনি বিধান হয় অস্বীকার করা হয়েছে অথবা একেবারেই লঘু করে দেখা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার একটা বাক্স ছাড়া চিকিৎসার আর কোন ব্যবস্থা ছিল না বল্লেই চলে।।(দি হিন্দু, ১/৮/১০) 

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা শ্রমিকরা আইনে স্বীকৃত ন্যুনতম মজুরীটুকুও পায়নি। শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরীর দুই-তৃতীয়াংশ অথবা অর্ধেক মজুরীতে সব সাইটে খাটিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের থাকতে হয়েছে মানুষের বসবাসের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযোগী এক জঘন্য অবস্থার মধ্যে-বলেছেন People’s Union of Democratic Rights-এর পক্ষে শশী সাক্সেনা (দি হিন্দু, ১৬/৮/১০)। বিশেষ করে তারা দিনে ১০/১২ ঘন্টা কাজ করেছে। রাত জেগেও কাজ করতে হয়েছে। ছুটির দিন বলে কিছু ছিল না। ওভারটাইম কাজ করার জন্য যৎসামান্য প্রাপ্যটুকু থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। দিনে ১০ ঘন্টা কাজের জন্য ১০০ টাকা এবং ১২ ঘন্টা কাজের জন্য ২০০ টাকা মাত্র দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থাকে চরম নিম্নমানের বলে PUDR বর্ণনা করেছে। অপ্রতুল পায়খানা-বাথরুম, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, ম্যালেরিয়া আর ডেঙ্গুর আঁতুরঘরে তাদের জীবনযাপন করতে হয়েছে। টিন আর প্লাষ্টিকে তৈরি শ্রমিকদের কুঁড়েঘরগুলি শীতে ঠাণ্ডা হিম, গ্রীষ্মে তেতে আগুন - দিল্লির আবহাওয়ায় এই ব্যবস্থা নারকীয় ছাড়া কিই বা বলা যাবে! (টাইমস অফ ইণ্ডিয়া)। ক্রেষ্ট নামে একটি কোম্পানী বিজয় নামের একজন শ্রমিককে নিয়োগ করেছিল যে দিনের বেলা ফুটপাথে গোলাপী টাইলস বসাত আর রাতে সেই টাইলস বসানোর গর্তেই থাকত। দেড়লাখ ভিন্‌রাজ্যের শ্রমিককে কমনওয়েলথ গেমস প্রকল্পে কাজে লাগানো হয়েছিল। শ্রমিকদের শিশুসন্তানদেরও থাকতে হয়েছিল এই জঘন্য পরিবেশে। তাদের স্কুলে পাঠানোর কোন ব্যবস্থাই ছিল না।

এই ভয়ানক অবস্থা যে কেবলমাত্র কমনওয়েলথ গেমসের ক্ষেত্রেই ছিলো তা নয়, কলকাতায় ৪৩ জন বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকের মৃত্যু সেই শোচনীয় অবস্থাকেই বিস্তৃত করে। (শ্রমিক পুড়ছে, ভারত গৌরবে ভাস্বর হচ্ছে )

পরিশেষে বলা দরকার, যেমনটা হয়েছিল বেজিঙ অলিম্পিকে, যেমনটা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ঠিক তেমনিভাবেই দিল্লির বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। যেন তারা ছিল সমাজের পক্ষে কোন ক্ষতিকর কীট। ২০০৯-এর ডিসেম্বরে একটি রাতের আস্তানা ভেঙে দিয়ে ২৫০ জন মানুষকে গৃহহীন করা হয়। ২০১০-এর এপ্রিলে ৩৬৫টি নিম্নবর্ণের তামিল পরিবারের একটি বস্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বানানো হয় গেমস ভিলেজের জন্য গাড়িপার্ক। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত স্বীকার করেন, গেমস শেষ হলে আমরা ত্রিশলক্ষ গৃহহীন মানুষ দেখতে পাব(দি আউটলুক- এপ্রিল,২০১০)।      

ভারতীয় অর্থনীতি : ক্যান্সার রোগগ্রস্ত তার বৃদ্ধি

 

শ্রমিকশোষণের এই ধারার ভিত্তিতেই ভারতীয় অর্থনীতি ২০১০ আর্থিকবর্ষে ১০.৮% হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আন্দাজ করা হচ্ছে। এর বেসরকারী কোম্পানীগুলি শক্তিশালী। ভারতীয় পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি হল লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী। এরা সবাই যেকোন ঝুঁকি নিতে পিছুপা নয়। প্রচন্ড তৎপরতার সঙ্গে লেগেপড়ে থেকে এরা নিজেদের উদ্যোগ ধান্দার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে(দি ইকনমিস্ট ০২.১০.১০)। আর পুঁজিবাদ ঠিক এটাই পছন্দ করে।

ভারতীয় অর্থনীতি শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থার উন্নয়ণের জন্য কিছুই করেনি। কমনওয়েলথ গেমস সাইট বর্বর শ্রমিকশোষণের একটি উদাহরণমাত্র। স্থায়ী কর্মসংস্থান ক্রমশ কমে আসছে, বাড়ছে অস্থায়ী ভিত্তিতে শ্রমিক নিযুক্তি। যেমনটা হয়েছে গুড়গাঁওয়ের হিরো হোন্ডার কারখানায়, অথচ হিরো হোণ্ডার বাইক উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪.৩ মিলিয়ন। ইতোমধ্যে এই অর্থনীতি বস্ত্র ও হীরে শিল্পে শ্রমিক ছাঁটাই ঘটিয়েছে। সরকারীভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১০.৭% - বাস্তবে চিত্রটা আরও ভয়াবহ। রেলষ্টেশন, পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে রিক্সা চালকদের অথবা একটা স্যুভেনির বিক্রির জন্য বেকারদের চীৎকার শুনলেই সেটা বোঝা যায়। এরা হলো সেইসব মানুষ যাদের উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অন্তর্ভূক্ত করতে পুঁজিবাদ নিতান্তই অক্ষম।

যেহেতু বাজারে প্রচুর টাকা এসেছে , অতএব স্বচ্ছল অর্থনীতিতে যেমন হয় সেইভাবে বেড়ে চলেছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান পরিবহন,  ইত্যাদি অত্যাবশ্যক প্রয়োজনগুলো মেটাতে শ্রমিকদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। বিনোদনের জন্য খরচের তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। খাদ্যদ্রব্যের মুদ্রাস্ফীতি সরকারীভাবে ১৮% ছুঁয়েছে।

বৃদ্ধির হার উর্দ্ধমুখী হলেও ভারতীয় অর্থনীতি কিন্তু কোনভাবেই পতনশীল পুঁজির প্রকোপ এড়াতে পারছে না।এই পতনশীল অবস্থা অনেককেই মন্দার ভয়ে ভীত করে তুলছে।এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অবদান।এরাই সব ২০০৮ সালের আগেকার ফাটকাবাজির অর্থনীতির অংশীদার ছিল।এটাই ২০০৭ সালে ঋণের সঙ্গে জিডিপির অনুপাত ২০ পয়েন্ট বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর পাবলিক ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে জিডিপির ৮৩%। এর ভিত্তি হচ্ছে পরিষেবা ক্ষেত্র, কলসেন্টারগুলির আউটসোর্সিং ইত্যাদি। দেশে শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়  পরিকাঠামোগত অভাব এখনও প্রবল। সস্তায় ছোট গাড়ি উৎপাদনের মতো শিল্পগুলিই কেবলমাত্র উন্নত হতে পেরেছে যেগুলি আবার একইভাবে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল এবং তা দেশের পরিষেবা ক্ষেত্রের শ্রমিকদের বাজারের কথা ভেবেই করা হচ্ছে। কৃষিতে অবস্থার অবনতি হওয়াতে বহুলোক শহরে যেতে বাধ্য হচ্ছে নতুবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে । এসব ঘটে যাচ্ছে অর্থনীতিতে বৃদ্ধির বর্তমান উর্দ্ধমুখী হার সত্ত্বেও।(দেখুন: The Indian Boom: Illusion and Reality’, https://en.internationalism.org/ci/2008/Indianboom) যাই হোক না কেন, কমনওয়েল্থ গেমস্‌, অলিম্পিক গেমস্‌ বা বিরাট বিরাট স্টেডিয়াম নির্মাণের মত বড় বড় চোখ ধাঁধানো ব্যাপার ও ঘটনাগুলো প্রায়ই দারুণ ব্যয়বহুল সাদাহাতী পোষার মত হয়ে থাকে। এগুলো কোনভাবেই কোন দেশের সুস্বাস্থ্যের লক্ষ্মণ নয়।

একমাত্র উত্তর : শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম

 

ভারতে শ্রমিকদের ভয়ানক শোচনীয় অবস্থারবর্ণনা  পড়ে মানুষ হিসাবে ক্ষোভ ও ঘৃণা চেপে রাখা অসম্ভব । PUDR এবং CRY (Child Relief and You) এ সম্পর্কে বহু তথ্য সংগ্রহ করেছে যার অনেকগুলো বর্তমান রচনায় ব্যবহার করা হয়েছে। যাইহোক এসব অপরাধের উত্তর গণতান্ত্রিক সংস্কারের মধ্যে নেই, ভারতে ইতোমধ্যেই গণতন্ত্র বিদ্যমান এবং  পুঁজিবাদ শ্রমিকদের পদদলিত করে চলেছে। এর উত্তর পাওয়া যাবেনা বুর্জোয়া আইনি রক্ষাকবচেও - আইনের তোয়াক্কা কেউ করে না। এর উত্তর পাওয়া যাবেনা কোন চ্যারিটি বা সেবামূলক কাজের ভিতেরও তা সে যতবেশি ব্যক্তিকেই সহায়তা দিক না কেন। ভারতীয় অর্থনীতি কবে শ্রমিকদের কল্যাণ করার মতো বৃদ্ধি অর্জন করবে তার জন্য অপেক্ষা করাও ঠিক হবে না। ভারতীয় অর্থনীতি সারা পৃথিবীর অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না।এই বিশ্ব অর্থনীতি ঋণভারে জর্জরিত। ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধির মূলেও র‍্য়েছে এই ঋণই।

এটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে পুঁজিবাদ থেকেই এসব অবস্থার সৃষ্টি।এর মূলে রয়েছে মুনাফার জন্য অক্লান্ত প্রাণপন চেষ্টা। পুঁজিবাদকে উৎখাত করেই এসবের অবসান ঘটানো সম্ভব। যতদিন না তা হচ্ছে ততদিন পুঁজির প্রতিটি আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির বিশাল বিশাল শ্রেণি সংগ্রামই কেবল সাময়িকভাবে এগুলোকে খানিকটা প্রশমিত করতে পারে। এরকমটাই করেছিল গুরগাঁওয়ের মোটর কারখানার শ্রমিকেরা, কলকাতার চটকল শ্রমিকেরা এবং এয়ার-ইন্ডিয়ার শ্রমিকেরা এবং কাশ্মীরের সরকারী কর্মচারীরা। ভারতীয় রাষ্ট্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম চলা সত্ত্বেও কাশ্মীরের শ্রমিক কর্মচারীরা শ্রেণিসংগ্রামে অটল ছিলেন। ( এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে আমাদের সাইট দেখুন)। শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামই হচ্ছে একমাত্র উত্তর।

অ্যালেক্স, ৮ই অক্টোবার ২০১০

দক্ষিণ কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী গনতন্ত্রের মুখোস ছিঁড়ে ফেলছে

আমরা সদ্য কোরিয়া থেকে খবর পেয়েছি যে সোস্যালিস্ট ওয়ারকারস লীগ অফ কোরিয়া/ SAnorunর আটজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কুখ্যাত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আইনে[i] বিচারাধীন অবস্থায় আটক রাখা হয়েছে। আগামী ২৭শে জানুয়ারী তাদের সাজা ঘোষণা করার কথা।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত বিচার এবং শাসকশ্রেণি যাকে বিচার বলে থাকে তার হাস্যকর প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। এই প্রসঙ্গে তিনটি তথ্যের উল্লেখ করা যেতে পারে।
প্রথমত সাউথ কোরিয়ার আদালতগুলি ধৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযোগ এর আগে বহুবার ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।[ii]
দ্বিতীয়ত এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে শত্রুর অর্থাৎ নর্থ কোরিয়ার সুবিধার্থে এরা একটা সংগঠন গড়ে তুলেছে। Oh Se-Cheol এবং Nam Goong Won এবং আরো অনেকে ২০০৬ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধ বিরোধী আর্ন্ত্জাতিক ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর করেন। ঐ ঘোষণা পত্রে পরিষ্কারভাবে নর্থ কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং বিশেষ করে বলা হয়েছে যে, নর্থ কোরিয়ার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সংগে শ্রমিকশ্রেণি বা কমিউনিজমের মোটেই কোন সম্পর্ক নেই। ঐ রাষ্ট্রব্যবস্থা পতনশীল পুঁজিবাদের চূড়অন্ত সামরিক বর্বরতার কদাকার এক সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়[iii]
তৃতীয়ত Oh Se-Cheolর আদালতে প্রদত্ত বক্তব্য থেকে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে সে নর্থ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদসহ সব ধরণের পুঁজিবাদের তীব্র বিরোধী।
এইসব রাজনৈতিক কর্মীরা সোস্যালিস্ট চিন্তনকে ধারণ করেন শুধুমাত্র এই অভিযোগেরই বলী হয়েছেন। অন্যভাবে বললে শ্রমিকশ্রেণিকে নিজেদের ও পরিবারের সুরক্ষা ও জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য সংগ্রামের আহ্বান জানানোই হল তাঁদের অপরাধ। এঁদের আরো অপরাধ পুঁজিবাদের আসল চেহারাটা খোলাখুলিভাবে শএরণির সামনে মেলে ধরা। এজন্যই প্রশাসন এঁদের শাস্তি দিতে চাইছে। শোষণ নিপীড়ণের বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়াতে চাইছে তাদের ওপরে সাউথ কোরিয়ার শাসককূল তীব্র নিপীড়ণ নামিয়ে আনছে।এই ঘটনা তারই একটা উদাহরণ মাত্র। ইতিমধ্যেই “baby strollers’ brigade”-র স্বল্পবয়সী মায়েরা এই নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন। এইসব মায়েরা তাদের শিশুদেরকে নিয়ে ২০০৮ সালের মোমবাতি নিয়ে মিছিল-এ যোগদান করেন। এই অপরাধে তাদের ওপর আইনী ও পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়।[iv] রায়টপুলিশ দখলীকৃত ফ্যাক্টরি আক্রমণ করে Ssangyong ওয়ার্কারদের প্রচন্ড মারধোর করে।[v]
অনেকবছরের কারাবাসের সাজার সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ঐ বন্দী রাজনৈতিক কর্মীরা আদালতে দারুণ সাহসিকতা ও সংগ্রামী মর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই বিচারের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে তাঁদের বক্ত্ব্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বিচারকমন্ডলীর সামনে Oh Se-Cheol সর্বশেষ বক্তব্যের অনুবাদ নিচে দেওয়া হচ্ছে।
এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।গত নভেম্বরে Yeonpyeong দ্বীপে প্ররোচনামূলক গোলাবর্ষণ এবং নর্থ কোরিয়ার কামানের গোলায় অসামরিক ব্যক্তিদের হত্যার পর এই উত্তেজনা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। এর জবাবে ঐ এলাকায় আমেরিকার পারমাণবিক যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠানো ও সাউথ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ যুদ্ধ মহড়া চালানো উত্তেজনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢালে। মানবসমাজের সামনে সমাজতন্ত্র ও বর্বরতার মধ্যে যেকোন একদিক বেছে নেওয়ার বিষয়টি এখন আগের থেকে অনেক বেশি সত্য ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীর প্রচার যন্ত্র নর্থ কোরিয়াকে একটি গুন্ডা প্রকৃতির রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করতে পছন্দ করে। দেখাতে চায় যে সেখানকার শাসকগোষ্ঠী বিলাসবহুল জীবনযাপন করে আর অনাহারক্লিষ্ট জনগনের ওপর শোষণ নিপীড়ণ চালায়। এটা অবশ্যই সত্য। কিন্তু সাউথ কোরিয়ার সরকার মায়েদের শিশুদের, সংগ্রামী শ্রমিকদের ও সমাজতন্ত্র অর্জণের লক্ষ্যে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর যে নিপীড়ণ চালিয়ে যাচ্ছে তাতে এটা যথেষ্ট পরিষ্কার যে শেষ বিচারে প্রতিটি দেশের বুরজোয়ারাই ভয় দেখিয়ে ও পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করেই শাসন চালায়।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে আমরা ওইসব বন্দী রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি আমাদের পূর্ণ সংহতি জ্ঞাপন করছি। তাদের সংগ্রাম আমাদেরও সংগ্রাম। আমরা তাদের পরিবার ও সহযোদ্ধাদের প্রতি জানাই আমদের আন্তরিক অনুভূতি এবং সংহতি। আমরা সানন্দে ঐসব সহযোদ্ধাদের কাছে www..internationalism.org-এ পাওয়া সমর্থন ও সংহতির যেকোন বার্তা পাঠিয়ে দেব।[vi]
Oh Se-Cheol -র আদালতে দেওয়া শেষবারের ভাষণ: (ভাষণের বিষয়বস্তুর অনুবাদ মূল কোরিয় ভাষা থেকে করা হয়েছে; বাংলা অনুবাদ ইংরাজি অনুবাদের ভার্সন থেকে করা হল)
পুঁজিবাদের সমগ্র ইতিহাসে যেসব সংকট এসেছে তাকে নানাবিধ তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এগুলোর একটা হল Catastrophe Theory বা বিপর্যয়ের তত্ত্ব। এর মতে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলো যখন একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাবে তখন পুঁজিবাদ আপনা আপনিই ধসে পড়বে আর শুরু হবে সাম্যময় যুগ, কল্পনার স্বর্গের বাস্তবায়নের যুগ। সর্বনাশা পরিণতির অনিবার্যতার বা চূড়অন্ত নৈরাজ্যবাদী এইসব চিন্তাভাবনা পুঁজিবাদী এইসব শোষণ, নিপীড়ণ ও শ্রমিকশ্রেণির দুর্ভোগের মূল কারণগুলো বোঝার ক্ষেত্রে নানারকম বিভ্রান্তি ও মোহ সৃষ্টিই করেছে। অনেকেই এইসব অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনায় প্রভাবিত হয়েছে।
আরেকটা তত্ত্বের মধ্যে আশাবাদের প্রাধান্য।এর মতে বুরজোয়া উৎপাদন ব্যবস্থার বৃদ্ধি সবসময়ই ঘটে থাকে; অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলো মোকাবিলা করার ক্ষমতা পুঁজিবাদেরই রয়েছে এবং ফাটকাবাজের(speculation) অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত(real) অর্থনীতির গতি প্রকৃতি ভালোভাবেই বহাল রাখা যায়।
অন্যগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া এবং এই দুই থেকে আরেকটু সূক্ষ্ম তত্ত্বের মতে পুঁজিবাদের সংকট হল পর্যাবৃত্ত, সুতরাং আমাদের কাজ ঝড়টা কেটে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
এই অবস্থানটা উনবিংশ শতকের পুঁজিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিকই ছিল। কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতকের পুঁজিবাদের অবস্থার সাথে এটা মোটেই খাপ খায় না। উনবিংশ শতকের সংকটগুলো ছিল পুঁজিবাদের সীমাহীন বৃদ্ধি ও বিস্তারের যুগের সংকট। এগুলোকেই মার্কস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলেছেন অতি উৎপাদনের মহামারী। অতি উৎপাদনের এই প্রবণতার পরিণতি হত দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র ও বেকারত্ব। এই পরিণতি জিনিসপত্রের অভাবের জন্য হত না। হত অনেক বেশি জিনিসপত্র অনেক বেশি শিল্প এবং অনেক বেশি সম্পদের জন্য। পুঁজিবাদী সংকটের আর একটা কারণ হল অনিবার্য প্রতিযোগিতার দরুণ উৎপাদন ব্যবস্থার নৈরাজ্য। নতুন নতুন এলাকা, নতুন নতুন মজুরী-শ্রম এবং পন্য বিক্রির উৎস দখলের মাধ্যমে উনবিংশ শতকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থঅর বিস্তার ও বৃদ্ধি ঘটা সম্ভব ছিল। তাই তখনকার পুঁজিবাদী সঙ্কটকে যৌবনের সুস্বাস্থ্যের সাময়িক ছন্দপতন মনে করা যেত।
বিংশ শতকের পুঁজিবাদের উথ্থানের যুগ শেষ হয়ে এল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই শেষ হয়ে যাবার প্রক্রিয়ার একটা নির্ণায়ক বিন্দু। এই সময় পর্যন্ত মজুরী শ্রম ও পণ্য উৎপাদনের পুঁজিবাদী সম্পর্ক সারা দুনিয়া জুড়ে বিস্তার লাভ করেছিল। ১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল পুঁজিবাদের এই নতুন যুগকে যুদ্ধ অথবা বিপ্লব-র যুগের আখ্যা দেন। একদিকে অতি উৎপাদনের পুঁজিবাদী প্রবণতা, বিশ্ববাজার দখল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠল। বেধে গেল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। অন্যদিকে এটা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীলতা ও বিনাশের সংকটের ওপর নির্ভরশীল করে তুলল। এই সংকট অনেকাংশে স্থায়ীরূপ লাভ করল। এই পরিস্থিতি উনবিংশ শতকের বিপরীত।
এই ধরণের দ্বন্দ্বের পরিণতি হল দুটো ঘটনা। একটা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যার বলী হল দুই কোটি মানুষ। আর একটা হল ১৯২৯-র চরম মন্দা যার ফলে বিশ থেকে তিরিশ শতাংশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ল। এরই জের হিসাবে গড়ে তোলা হল তথাকথিত সব সমাজতন্ত্রী দেশ। উৎপাদনের উপকরণগুলোর সবকিছুর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকেই সমাজতন্ত্র বলে চালানো হল। অন্যদিকে ব্যক্তিগত পুঁজি রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের সংমিশ্রণের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হল উদারনৈতিক সব দেশ বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর তথাকথিত সমাজতন্ত্রী দেশসমূহসহ বিশ্ব পুঁজিবাদের অসাধারণ সমৃদ্ধি ঘটে। ২৫ বছরের পুণনির্মাণ এবং ক্রমবর্ধমান ঋণনীতির ফলেই এটা ঘটে। এই সমৃদ্ধি দেখে সরকারী আমলাকূল, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, অর্থনীতিবিদ এবং তথাকথিত র্মাসবাদীরা জোরগলায় বলতে থাকে যে পুঁজিবাদ নিশ্চিতভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু সঙ্কট লাগাতারভাবে আরও খারাপের দিকে গেছে। এর প্রমাণ স্বরূপ কিছু তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হল: ১৯৬৭ সালে পাউন্ড স্টারলিং এর অবমূল্যায়ন, ১৯৭১ এর ডলার সঙ্কট, ১৯৭৩ এর তেল সঙ্কটের আকস্মিক আঘাত, ১৯৭৪-৭৫ সালের অর্থনৈতিক মন্দা, ১৯৭৯ সালের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্কট, ১৯৮২ সালের ঋণসংকট, ১৯৮৭-র ওয়াল স্ট্রীট সঙ্কট, ১৯৮৯-র অথনৈতিক মন্দা,১৯৯২-৯৩-এ ইউরোপীয়ান কারেনসির মূল্যের অস্থিতিশীলতা, ১৯৯৭এ এশিয়ার টাইগার আর ড্রাগনদের সংকট, ২০০১-এ আমেরিকান নিউ ইকনমির সংকট, ২০০৭এর সাবপ্রাইম ক্রাইসিস, লেম্যান ব্রাদার্স ইত্যাদির ফিনানসিয়াল সংকট এবং ২০০৯-২০১০-র ফিনানসিয়াল ক্রাইসিস।
ক্রাইসিসের এই লম্বা সারণী কি দেখায় যে সংকট নেহাতই পিরিয়ডিক? মোটেই না! এ হল পুঁজিবাদের মারণ রোগ যার কোন আরোগ্য নেই। যেখান থেকে পুঁজিবাদ তার মুনাফা তুলে আনতে পারে সেই বাজারের অপ্রতুলতার ফলে   মুনাফার হার ক্রমশঃ কমে যেতে থাকে। ১৯২৯-র বিশ্বব্যাপী বিরাট মন্দার সময়ে চূড়ান্ত খারাপ পরিস্থিতি আসে নি কারণ রাষ্ট্রগুলো ভীষণভাবে তাদের হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ফিন্যানসিয়াল এবং ইকোনোমিক ক্রাইসিস দেখাচ্ছে যে আগের মত স্টেট কর্তৃক বেল আউট বা ঋণ ইত্যাদি কিছু আশু পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। উৎপাদিকা শক্তির আরো বিস্তারের অসম্ভাব্যতার কারণে ক্যাপিট্যালিজম এখন এক দিশাহীন অচলাবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে। আর পুঁজিবাদের বর্তমান মরণপন চেষ্টা হল এই কানাগলি থেকে বেরোন; অর্থাৎ এ এখন সীমাহীনভাবে রাষ্ট্রীয় ঋণের ওপর নির্ভরশীল আর তার চেস্টা হল অতিউৎপাদনের মারণরোগ থেকে বাঁচার জন্য কৃত্রিম বাজার সৃষ্টি করা।
গত চল্লিশ বছর পুঁজিবাদ বিপুল ঋনের সাহায্যেই তার সর্বনাশা পরিণামের হাত থেকে রেহাই পেয়ে আসছে। পুঁজিবাদের কাছে এই ঋণ ড্রাগ-এ্যাডিক্টের কাছে ড্রাগের সমতুল। শেষ পর্যন্ত এই ঋণ রক্ত আর ঘাম নিংড়ে নেওয়া এক অসম্ভব বোঝা হিসাবেই  বিশ্বের প্রলেতারিয়েতের কাছে ফিরে আসে এবং আসবে। এর ফল হল বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অবিশ্বাস্য দারিদ্র, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়।
পুঁজিবাদ কি পতনশীল পর্যায়ে আছে? হ্যাঁ। হঠাৎ করে এই ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবার দিকে এটা এগোচ্ছে না, কিন্তু এটা ব্যবস্থাটার পতনের এক নতুন দশা যা হল পুঁজিবাদের ইতিহাসের শেষ পর্যায়  সেই দিকেই এগোচ্ছে, তাকে নিয়ে যাচ্ছে তার সমাপ্তির দিকে। আমাদের অবশ্যই মনে করা দরকার ১০০ বছর আগের সেই শ্লোগান: যুদ্ধ অথবা বিপ্লব এবং আরো একবার আমাদের নিজেদের প্রস্তুত করা উচিত বর্বরতা অথবা সমাজতন্ত্র এই বিকল্পের অর্থ উপলব্ধি করার জন্য এবং তৈরি হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুশীলনের জন্য। অর্থাৎ সোস্যালিস্টদের অবশ্যই একত্র হতে এবং একসঙ্গে কাজ করতে হবে; তাদের অবশ্যই বিপ্লবী মার্কসবাদের ভিত্তিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। আমাদের লক্ষ্য টাকা, পন্য, বাজার মজুরী-শ্রম এবং বিনীময় মূল্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে অতিক্রম করা এবং এমন এক দুনিয়া গড়া যেখানে সমস্ত মানুষ মুক্ত স্বাধীন, যেখানে মজুরী দাসত্বের নিগড় থেকে শ্রম সম্পূর্ণভাবে মুক্ত
মার্কসীয় বিশ্লেষণ থেকে এটা সুনিশ্চিত যে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সাধারণ সংকট ইতিমধ্যেই তার চূড়ান্ত সংকটকালীন অবস্থায় পৌঁছে গেছে; তার কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে লাভের হারের ক্রমাগত হ্রাস এবং বাজার সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া। আমরা এখন দুই বিকল্পের মুখোমুখি: পুঁজিবাদ অর্থাৎ বর্বরতা অথবা সোস্যালিজম্‌/কমিউনিজম্‌ অথাৎ সভ্যতা।
প্রথম, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এ তার অধীন মজুরীদাসেদেরকেই খেতে দিতে পারে না। পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন এক লক্ষ মানুষ অনাহারে থাকে, প্রতি ৫ সেকেন্ডে পাঁচ বছর বয়সের কম বয়েসী একজন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। ৮৪২ মিলিয়ন মানুষ স্থায়ীভাবে অপুষ্টির শিকার। ভয়ংকরভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর ৬ বিলিয়ন জনসাধারণের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষের প্রতিমুহূর্ত্তে দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে প্রাণান্ত হচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ, বর্তমানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর কোনভাবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতির গল্প শুনিয়ে মানুষকে ভোলাতে পারে না।
ভারত এবং চীনে অর্থনৈতিক উন্নতির যাদু যে মিথ্যা এবং ধোঁকা তা প্রমানণিত হয়ে গেছে। ২০০৮-র প্রথম অর্ধে ২০ মিলিয়ন শ্রমিক তাদের কাজ খুইয়েছে এবং ৬৭০০০ কোম্পানী দেউলে হয়ে গেছে।
তৃতীয়তঃ, পরিবেশগত দিকথেকে এক ভয়ঙ্কর বিপদ খুবই প্রত্যাশিত। বিশ্ব-উষ্ণায়ণের ব্যপারে দেখা যাচ্ছে ১৮৯৬ থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ০.৬% বেড়ে গেছে। বিংশ শতাব্দীতে উত্তর গোলার্ধ গত ১০০০ বছরের তুলনায় অত্যন্ত বেশিমাত্রায় উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বরফঘেরা স্থানের পরিমাণ ১০ শতাংশ কমে গেছে। উত্তর মেরুতে বরফ-স্তর ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। বিংশ শতকে সমুদ্র তলের উচ্চতা ১০ থেকে ২০% বেড়ে গেছে যা গত ৩০০০ বছর ধরে বৃদ্ধির পরিমাণের ১০গুনেরও বেশি। যথেচ্ছভাবে অরণ্যনিধন,ভূমিক্ষয়, (জল, বাতাস)দূষণ,রাসায়নিক এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবহার, প্রাণি এবং উদ্ভিদ নিধন এবং বিস্ফোরণের মত মহামারীর প্রাদুর্ভাব এইসবই ধরণীকে গত ৯০ বছরের নির্মমভাবে শোষণ করার প্রতিফলন। পরিবেশগত ডিজেস্টার বিশ্বজোড়া ব্যাপার আর তাই এই সমস্যা ভবিষ্যতে কত গভীর এবং বিপজ্জনকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে তা আগে থেকে বলে দেওয়া দুঃসাধ্য।
তাহলে কেমন করে পুঁজিবাদী অবদমন এবং শোষণের বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বিকশিত হল?
শ্রেণি সংগ্রাম সর্বদাই আছে কিন্তু তা সফল হয়নি। প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যর্থ হয়েছিল কেননা সেটা ছিল পুঁজিবাদের বিকাশের যুগ। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ব্যর্থ হয় বিপ্লবী চরিত্র পরিত্যাগ করে জাতীয়তাবাদের পক্ষে চলে যাওয়ার জন্য। এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিক ব্যর্থ হয় স্ট্যালিনিস্ট প্রতিবিপ্লবের বিজয়ের কারণে; বিশেষতঃ ১৯৩০ থেকেই প্রতিবিপ্লবী ধারা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে শ্রমিকশ্রেণিকে মিথ্যা ধারণা দেয় এবং সেটাকেই সমাজতন্ত্র বলে প্রচার করে। শেষ পর্যন্ত তারা দুটো ব্লকের মধ্যে সংগ্রামকে আড়াল করেবিশ্ব প্রলেতারিয়েতের সংগ্রামকে অবদমিত করে, শোষণ করে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারেরই ভূমিকা পালন করল।
পরন্তু, বুরজোয়াদের প্রচার অনুযায়ী ইস্টার্ণ ব্লক এবং স্ট্যালিনিস্ট ব্যবস্থার পতন হল উদারপন্থী পুঁজিবাদেরই বিজয়,শ্রেণিসংগ্রামের অবসান এমনকি শ্রমিকশ্রেণিরই বিলুপ্তি। এমন প্রচার শ্রেণির সচেতনতা এবং লড়াকু চরিত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলল।
১৯৯০-র পুরো দশক ধরে শ্রেণির সংগ্রাম পুরো থেমে যায়নি তবু তার আপেক্ষিক তাকত কমে গিয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্সে পেনসনের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামে আবার এক নতুন বাঁক নিয়ে এল। সেন্ট্রাল দেশগুলোর প্রায় সর্বত্র শ্রেণি নতুন করে সংগ্রাম শুরু করে: ২০০৫-এ নিউইয়র্কে বোয়িং এবং ট্রান্সপোর্টেসন স্ট্রাইক; ২০০৪-এ ডেইমলার এবং ওপেল সংগ্রাম,২০০৬-র বসন্তে ডাক্তারদের সংগ্রাম, ২০০৭এ জার্মানে টেলিকম বিভাগের সংগ্রাম, ২০০৫-এর অগাস্টে লন্ডন এয়ারপোর্ট সংগ্রাম, ২০০৬এ ফ্রান্সে অ্যান্টি সিপিই সংগ্রাম এরই প্রতিফলন। অন্যান্য দেশগুলোতেও সংগ্রাম গড়ে উঠেছে যেমন, ২০০৬-র বসন্তে দুবাইএ, একই সময়ে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শ্রমিকদের সংগ্রাম, ২০০৭এ ইজিপ্টে টেক্সটাইল শ্রমিকদের সংগ্রাম। ২০০৬ থেকে ২০০৮এর মধ্যে বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে, ইজিপ্ট, দুবাই, আলজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা, পেরু, টুরকি, গ্রীস, ফিনল্যান্ড, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রাশিয়া, ইটালি, বৃটেন, জারমানি, ফ্রান্স, ইউএসে এবং চীন সর্বত্র। পেনসন সংস্কারের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সংগ্রামে যেমনটা দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম আরো বেশি বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
ফলতঃ বোঝা যাচ্ছে চূড়ান্ত অবক্ষয়িত বিশ্ব পুঁজিবাদ ও সংকট (যা শ্রমিকশ্রেণির ওপর বিপুল বোঝার মত চেপে বসে আছে) শ্রমিকশ্রেণিকে সারা বিশ্ব জুড়েই সংগ্রামের পথে যেতে বাধ্য করছে। এ সংগ্রাম পূর্বতন সংগ্রামের থেকে আলাদা।
এখন আমাদের সামনে দুটি রাস্তা: বর্বরতার মধ্যে বাস কর, মানুষের মত নয় বাঁচ পশুর মত অথবা গড় সেই দুনিয়া যেখানে আনন্দময় হবে বাঁচা,বাস করা যাবে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা নিয়ে, সাম্যের মধ্যে, স্বাধীনতার মধ্যে।
তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কোরিয়ান পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীন স্ববিরোধিতার গভীরতা এবং বিস্তার অনেক বেশি । ইউরোপীয় দেশগুলোর শ্রমিকশ্রেণি তাদের অতীতের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অনেক অধিকার আদায় করেছে; এই দিক থেকে দেখলে ইউরোপীয় দেশগুলোর শ্রমিকদের তুলনায় কোরিয়ার শ্রমিকদের যন্ত্রনা অনেকগুন বেশি। প্রশ্নটা শ্রেণির মানব জীবনের, মানুষ হিসাবে তাদের জীবনযাপনের অবস্থার; এটা জি-টোয়েন্টি সামিটের আয়োজক দেশ হওয়ার বাহ্যারম্বর বা অর্থনীতির গালভরা সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না।
পুঁজি চরিত্রগত ভাবেই আন্তর্জাতিক। বিভিন্ন জাতীয় পুঁজির মধ্যে সদা সর্বদাই প্রতিযোগিতা এবং বিরোধ আছে, তবে পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থাটা টিকিয়ে রাখার এবং তার সংকট গোপন করা ও শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ মানবিক মুখোশের আড়ালে রাখার জন্য তারা পরস্পরের মধ্যে একত্রিত হয়।
শ্রমিকদের সংগ্রাম পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে নয়, তার সংগ্রাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে পুঁজিবাদ মুনাফা বৃদ্ধি আর সীমাহীন প্রতিযোগিতার লক্ষ্যেই চালিত।
ঐতিহাসিকভাবে মার্কসবাদীরা শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে থেকে লড়াই করেছে যে শ্রমিকশ্রেণি বর্তমান ইতিহাসের নায়ক; আর এই লড়াই-এ সাথ দিতে গিয়ে মার্কসবাদীরা মানব সমাজের গতির ঐতিহাসিক নিয়মগুলোর স্বরূপ উদঘাটন করে, দেখায় বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে মৌল নিয়মগুলো কেমনভাবে ক্রিয়াশীল, প্রকৃত মানব জীবনের পক্ষে উপযুক্ত বিশ্বের পথে যাওয়ার অভিমুখ নির্দেশ করে এবং সেই পথে যাওয়ার জন্য এই অমানবিক ব্যবস্থা ও তার নিয়মের শেকল কিভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা দেখিয়ে দেয়।
আর এই কাজ করার জন্যই তারা পার্টির মত সংগঠন গড়ে তোলে এবং বাস্তব সংগ্রামে অংশ নেয়। অন্তত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মার্কসবাদীদের এই সব বাস্তব কর্মকান্ড আদালতের দরবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়নি।বরং তাদের চিন্তাভাবনা এবং চর্চাকে মানব সমাজের প্রগতির পথে মূল্যবান অবদান হিসাবেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্যাপিটাল বা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-র মত মাস্টারপিস লেখা বাইবেলের মতই ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে।
SWLK-র এই কেসটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা যা চিন্তনের স্বাধীনতাকে অবদমিত করার ভেতর দিয়ে সারা বিশ্বের সামনে কোরিয়ান সমাজের বর্বর প্রকৃতিটা নগ্নভাবে তুলে ধরছে; সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে যেসব বিচার আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে হয়েছে সেই ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক ঘটনা একটা কলঙ্কজনক ছাপ রেখে যাবে। ভবিষ্যতে আরো খোলাখুলি এবং আরো বিপুলাকারে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম হবে, মার্কসীয় আন্দোলন ব্যাপকভাবে এবং আরো শক্তিশালী হয়ে সারা বিশ্বে এবং এই কোরিয়াতেও ছড়িয়ে পড়বে। বিচার ব্যবস্থা সংগঠিত ভায়োলেন্স সংক্রান্ত কেসের বিচার করবে, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম, মার্কসবাদী সংগ্রাম দমিয়ে রাখতে তা অক্ষম। কারণ যতদিন মানবতা এবং শ্রমিকশ্রেণির অস্তিত্ব থাকবে ততদিন এই সংগ্রাম জারী থাকবেই।
সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম, এবং তার অনুশীলন আদালতের শাস্তির বিষয় হতে পারেনা। বরং তা হওয়া উচিত শ্রদ্ধার বিষয়, ভরসার বিষয়। আমার শেষ কয়েকটি কথা:
-        যে নিয়ম চিন্তনের, বিজ্ঞানের এবং প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করে সেই ন্যাশানাল সিকিউরিটি ল বাতিল কর!
-        উৎপাদনের মালিকানা, রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য, ইতিহাসের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার জন্য শ্রমিকশ্রেণির যে সংগ্রাম তার ওপর পুঁজিবাদের শাসন নিপীড়ণ ও অত্যাচার বন্ধ কর!
-         পুঁজিবাদকে ধ্বংস করে মুক্ত ব্যক্তি মানুষের এক বিশ্ব মানব সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দুনিয়ার শ্রমিকশ্রেণি এক হও!


[i] Oh Se-Cheol, Yang Hyo-sik, Yang Jun-seok, and Choi Young-ik face seven years in prison, while Nam Goong Won, Park Jun-Seon, Jeong Won-Hyung, and Oh Min-Gyu are facing five years. At its most extreme, the National Security Law provides for the death penalty against the accused.
 
 
[vi] We also draw our readers' attention to the protest initiative launched by Loren Goldner (http://libcom.org/forums/organise/korean-militants-facing-prison-08012011). While we share Loren’s scepticism about the effectiveness of “write-in” mail campaigns, we agree with him that “an international spotlight on this case just might have an effect on the final sentencing of these exemplary militants”. Letters of protest should be sent to Judge Hyung Doo Kim at this address: swlk [at] jinbo.net (messages must be received by 17th January for them to be forwarded on to Judge Kim).
 

Communist Internationalist - 2012

৩০ শে জুন: সময় এসেছে আমাদের লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই তুলে নেওয়ার!

শিক্ষা, সরকারী অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় দশলক্ষ শ্রমিক ৩০শে জুন(২০১১) ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন?

 সেই একই কারণে যে কারণে ২৬শে মার্চ পাঁচলক্ষ শ্রমিক শ্রমিক লন্ডনের রাজপথে মিছিল করেছিল; সেই একই কারণে যে কারণে গত শরতে ইউনিভার্সিটি এবং স্কুলের দশহাজার ছাত্রছাত্রী মিছিল, জমায়েত ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে আন্দোলনে সামিল হয়ে ছিল। জীবন যাত্রার ওপর সরকারের অন্তহীন আক্রমণে শ্রমিকেরা জেরবার।   স্বাস্থ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যয় সংকোচ, টিউশন ফিজ বৃদ্ধি, বেকারি বেড়ে যাওয়া, বেতনবৃদ্ধি বন্ধ করা ইত্যাদি নানাভাবে এই আক্রমণ নেমে আসছে। ৩০শে জুনের যেটা একটা মেজর ইস্যু সেই টিচারদের পেনসনের ওপর অ্যাটাকের কথাই ধরা যাক যাতে ক’রে পেনশন পাওয়ার জন্যে জমা রাখতে হবে আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ টাকা, রিটায়ার করতে হবে দেরিতে এবং পেনসন পাবে দেয় টাকার তুলনায় অনেক কম; এই হচ্ছে বাস্তব পরিস্থিতি।
প্রতিটি আক্রমণের পিছনে সরকারের এবং সামান্য  তফাৎ রেখে ‘বিরোধী’ লেবার পার্টির যুক্তি: “অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতেই এইসব পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে সুতরাং আসলে প্রতিটি মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত করাই এসবের উদ্দেশ্য।”  কিন্তু শ্রমিক, ছাত্র বেকার পেনসনভোগী কেউই এই যুক্তি আর তেমনভাবে সমর্থন করতে পারছে না। দীর্ঘকাল ধরে এই যুক্তি মেনে বহু আত্মত্যাগ মানুষ করেছে। তা সত্ত্বেও অর্থনীতি আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রার মানের ক্রমাবনতি ঘটেই চলেছে।
প্রতিদিন আরো বেশি বেশি সংখ্যায় খেটে খাওয়া মানুষ বুঝতে পারছে যে আমরা সর্বত্র একই আক্রমণের শিকার; আর বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই ক’রে শেষপর্যন্ত হারতেই হচ্ছে। ফলে আরো বেশি বেশি ক’রে এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করা যাচ্ছে যে ওরকম বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন আন্দোলনের পরিবর্তে সর্বাত্মক, সর্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। বুঝতে পারছে আমাদের লড়াই যতদূর এবং যত বেশি বেশি ক্ষেত্র জুড়ে সম্ভব ততদূর তাকে বিস্তৃত করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে “একদিনের কর্মসূচী” কে নিয়ে: সরকার-স্বীকৃত ট্রেডইউনিয়নগুলোর এই একদিনের স্ট্রাইক ডাকার পিছনে আসল উদ্দেশ্য কী? সরকারের এইসব আক্রমণের বিরুদ্ধে এরা সত্যি সত্যিই কি কোন কার্যকর সংগঠিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়? যদি সত্যিই তাই হত তাহলে ২৬শে মার্চ হাজার হাজার মানুষকে লন্ডনে জড়ো করা হল কেন? --- মিছিলে ঘুরিয়ে আর এড মিলিবান্ডের মত লোকেদের দ্বিচারিতায় ভর্তি ভাষণ শুনিয়ে ঘর পাঠানোর জন্যে? কেন ইউনিয়নওয়ালারা আমাদের এই ধাপ্পাটা গেলাতে চাইছে যে ব্যয় সংকোচের বিষয়টা নেহাতই বর্তমান সরকারের ব্যাপার অর্থাৎ কিনা লেবার পার্টি ক্ষমতায় থাকলে এমনটা হত না?
প্রশ্ন থাকছে কেন বিরাট পাবলিক সেক্টরের মাত্র একটা ছোট্ট অংশকেই শুধু ডাকা হল? বাকি সবকে নয় কেন? কেন প্রাইভেট সেক্টরের সমস্ত শ্রমিকদের ডাকা হল না? তারা কি আক্রান্ত নয়? কেনই বা একদিনের কর্মসূচী? সেই ২৬শে মার্চের মত আবারো কি তারা আমাদেরকে দিয়ে লড়াই-লড়াই খেলা করাতে চাইছে যেন বা আমরা সত্যিই সমস্ত আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ছি? আসলে এভাবেই কি তারা আমাদের বৃথা শক্তিব্যয় করাতে আর আমাদের নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে?
শাসকশ্রেণির আমাদেরকে ভয় পাওয়ার কারণ আছে বৈকি
যে পরিমাণ ক্ষোভ বিক্ষোভ সহজে সামাল দেবার ক্ষমতা শাসক-শ্রেণির আছে, সরকার গৃহীত শ্রমিকবিরোধী পদক্ষেপগুলো যে তার চাইতেও অনেক বেশি মাত্রায় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে এই আশঙ্কা করার যথেষ্ট যুক্তি আছে। গত শরতে বৃটেনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বা ২৬শে মার্চের জমায়েতে হাজিরার সংখ্যাই শুধু নয়, শাসক-শ্রেণির সামনে আছে উত্তর আফ্রিকা থেকে সুদূর মধ্য-প্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের জোয়ারের টাটকা উদাহরণ যা এখন ইউরোপে এসে আছড়ে পড়ছে যার ফলে স্পেন এবং গ্রীস এখন বিশাল গনআন্দোলনে উত্তাল। ইউরোপের এই দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ সাধারণ জনতা যাদের অধিকাংশই যুবা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিটি স্কোয়্যারগুলো দখল ক’রে সংগঠিত করছে বিশাল বিশাল সাধারণ-সভা(general assembly)। সভায় মত প্রকাশে কোন বাধা নেই তা সে এই সরকার বা ওই সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েই হোক বা যে ব্যবস্থার অধীনে আমরা বেঁচে আছি সাধারণ ভাবে সেই সমগ্র সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েই হোক। এই আন্দোলন এখনও অব্দি কোন ‘বিপ্লব’ নয় কিন্তু এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে এটা এমন এক আবহ তৈরি করেছে যেখানে বিপ্লব সম্পর্কে গভীর এবং বিস্তৃত আলোচনা একটা জায়গা ক’রে নিয়েছে।
স্বভাবতই বৃটেন রাষ্ট্র চাইবেই জনগনের প্রতিরোধে ফেটে পড়াটাকে রাষ্ট্র-স্বীকৃত ঘেরাটোপের মধ্যেই বন্দী ক’রে রাখতে, আর এব্যাপারে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে কার্যকর। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কাজই হল ট্রেডইউনিয়ন-অধিকার সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে আমাদের আন্দোলনকে আটকে দেওয়া। এই বিধি-নিষেধ অনুযায়ী গন-সভার সিদ্ধান্ত মেনে কোন ধর্মঘট ডাকা যাবে না।  অন্য কোন সেক্টরের ধর্মঘটের সমর্থনে কোন’সংহতি-মূলক ধর্মঘট করা যাবে না। যদি এমনকি কোন সেক্টরের পিকেটিং কর্মসূচী চলে তবে অন্য সেক্টরের ওয়ার্কারদের তাতে যুক্ত হয়ে পড়া চলবে না, অন্যথায় তা বেআইনী ‘ গৌণ কর্মসূচী(Secondary action)’ হিসাবে গণ্য হবে। নিয়মিত সদস্যপদ নবীকরণ করা থাকলে তবেই কোন শ্রমিক কোন ধর্মঘটে সামিল হতে পারবে। এইরকম আরো সব নিয়মবিধি।
আমাদের সংগ্রামের কর্ণধার হতে হবে আমাদেরকেই।
   তাহলে ৩০শে জুনের কর্মসূচী কি নেহাতই টাইম নষ্ট?
না, তা হবে না যদি আমরা সেদিনটাকে সবাইমিলে একত্র হবার একটা সুযোগ বলে ভাবতে পারি, যদি সময়টাকে কাজে লাগাই, মানে যদি আমরা সম্মিলিতভাবে আলোচনা করি, সিদ্ধান্ত করি কী উপায়ে আমরা আমাদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনকে সঠিকরূপে এবং সঠিকপথে পরিচালনা করতে পারি, কিভাবে তা আরও ছড়িয়ে দিতে পারি। সেদিনটা বৃথা যাবে না যদি আমরা ভয় কাটিয়ে উঠে আমাদের সংগ্রামের রাশ আমাদের হাতেই তুলে নিতে পারি।
তিউনিসিয়া, ঈজিপ্ট স্পেন অথবা গ্রীসের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে: যখন প্রচুর মানুষ কোথাও একত্রিত হচ্ছে, যখন তারা পাবলিক স্পেস দখল ক’রে দাবী তুলছে স্বাধীন মত প্রকাশ করার স্বাধীনতার, দাবী তুলছে সকলে মিলে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তখনই তারা পুলিশি নির্যাতন কিংবা কতৃপক্ষের শাস্তির ভয় কাটিয়ে উঠতে পারছে।
তারা আমাদের সামনে একটা মডেল হাজির করেছে- মডেলটা অবশ্য নতুন নয়, গত শতাব্দীর সমস্ত বড় বড় শ্রমিক-সংগ্রামে এই মডেল ছিল: উন্মুক্ত সাধারণ-সমাবেশ (যাকে ইংরাজিতে বলা হয় ‘জেনারেল এ্যাসেমব্লি’)। সাধারণ-সমাবেশ বিভিন্ন কাজের পরিচালনার জন্য হাত তুলে সমর্থনের ভিত্তিতে নির্বাচিত করে বিভিন্ন প্রতিনিধি এবং কমিসন। সাধারণ-সমাবেশের হাতে থাকে এই সমস্ত প্রতিনিধি এবং কমিসনের নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচিত যেকোন প্রতিনিধি কিংবা কমিসন যেকোন সময় প্রত্যাহারযোগ্য এবং সে সিদ্ধান্ত নেবে বিপুল মানুষের সম্মিলনে তৈরি এই সাধারণ- সমাবেশই।
৩০শে জুনের আগে আমরা নিজ নিজ কর্মস্থলে সাধারণ সভা করতে পারি, কে কোন্‌ কাজ করে বা কে কোন্‌ ইউনিয়নের লোক এসব না দেখে সব কর্মচারীরা মিলে সিদ্ধান্ত নিতে পারি কীভাবে আন্দোলন কর্মসূচীকে যতদূর সম্ভব ব্যাপক আকার দেওয়া যায়। স্কুল কলেজগুলোতে শিক্ষক,শিক্ষাকর্মীর মধ্যেকার পেশা এবং পদভিত্তিক বিভেদ এবং তাদের সকলের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিভেদ কাটিয়ে সকলকে আন্দোলনে সামিল করার লক্ষ্যে কাজ করা একান্ত দরকারী। স্থানীয় পৌরসংস্থা এবং সরকারী দপ্তরগুলোর বেলাতেও একই কথা:   একত্রিত হয়ে সভা করা, আলাপ আলোচনা করা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে পেশা এবং পদভিত্তিক বিভেদের ব্যাপারটা অতিক্রম করা সহজ হতে পারে এবং এভাবে সকলেই যাতে আন্দোলনে সামিল হয় তা নিশ্চিত হতে পারে। অফিসিয়ালি যতলোকের থাকার কথা দেখা দরকার সংখ্যাটা যেন তাকে ছাড়িয়ে যায়।
ধর্মঘটের দিন আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে পিকেটিংটা যেন নেহাত প্রতীকী না হয়ে আন্দোলনটাকে যতটা সম্ভব বিস্তৃত এবং গভীর করার কাজে ব্যবহার করা যায়; এজন্য প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মচারীকে আমাদের আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হবে, ‌আন্দোলনে সামিল করার চেষ্টা করতে হবে; আন্দোলনরত অন্যান্য সেক্টরে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে হবে। চেষ্টা করতে হবে কীভাবে ভবিষ্যতে এই সংগ্রামকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই নিয়ে আলাপ আলোচনার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার।
সমাবেশ যেন কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় প্রথামাফিক পদযাত্রার কর্মসূচীতে পরিণত না হয়। সমাবেশের ফলে রাস্তায় রাস্তায় যে জমায়েতগুলো হয় সেটা যেন রাজনৈতিক নেতা আর ইউনিয়ন কর্তাদের পূর্ব-পরিকল্পিত ভাষণ দেওয়ার মঞ্চ না হয়ে ওঠে, বরং সেখানে যেন যত বেশি বেশি সম্ভব সাধারণ মানুষেরা তাদের অভিজ্ঞতা বিনীময় করতে পারে, তারা কী ভাবে ভাবছে তা যেন খোলাখুলি রাখতে পারে এটা দেখা ভীষণ জরুরী।
নানাদিকথেকে, বিশেষতঃ বামপন্থীদের মুখ থেকে এমন কথা শোনা যাচ্ছে যে সরকার এইসব শ্রমিক-স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপগুলো না নিলেও পারত, এগুলো নেহাতই সরকারের ভ্রান্ত আর্থিক-নীতির ফল। কিন্তু প্রকৃত বাস্তব হল সংকটাপন্ন পুঁজিবাদের পক্ষে আমাদের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা একান্ত প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য। আমাদের অর্থাৎ শোষিত মানুষের কাছে দরকারী বিষয় হল শোষকরা তাদের ব্যবস্থাটাকে কীভাবে আরেকটু বেটার উপায়ে চালাবে সে ব্যাপারে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা না করা। শাসক-শ্রেণির কিসে ভালো হবে সে সব পরামর্শ দেওয়া শোষিত শ্রেণির কর্মসূচী হতে পারে না। আমাদের কাজ বর্তমান এবং ভবিষ্যতের যাবতীয় পুঁজিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা আর তা করতে গিয়ে ক্রমাগত আরো বেশি ক’রে আমরা অর্জন করব নিজেদের ক্ষমতার ওপর আস্থা এবং প্রত্যয়,গড়ে তুলতে সক্ষম হবো স্ব-সংগঠন আর বাড়িয়ে তুলতে পারব রাজনৈতিক সচেতনতা। আর এভাবেই বিপ্লব এবং সমগ্র বিশ্বসমাজের আমূল রূপান্তরের অপরিহার্যতার প্রশ্নটা মূর্তরূপ লাভ করবে।
WR/  04. 06. 2011

Communist Internationalist - 2013

বর্তমানে ফ্যাসিজমের বিপদ আছে কী? (Is there a danger of fascism today?)

(নিম্নলিখিত প্রবন্ধটি (World Revolution) ওয়ার্ল্ড রিভলিউসন পত্রিকার৩৫৬ নং সংখ্যার বঙ্গানুবাদ।)

গত ৩০শে জুন ২০১২-য় প্যারিসে আইসিসির একটা পাবলিক মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনাটা শুরু করতে এবং তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে আমরা একটি লিখিত প্রেজেনটেসন্‌ রাখি।  বর্তমান প্রবন্ধটা তার ওপর ভিত্তি করে লিখিত।
অতি দক্ষিণপন্থীদের নির্বাচনী সাফল্য কিছুসময় ধরে ফ্যাসিজমের উত্থানের আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সত্যি বলতে কি,  প্ররোচনামূলক, অন্য দেশের প্রতি তীব্র ঘৃণা(Xenophobic) ছড়ানো এবং উগ্র জাতিবিদ্বেষী(racist) বক্তব্য দিয়ে এই রাজনৈতিক দলকে আলাদাভাবে চেনা যায়।
এবং এটাও সত্যি যে তাদের বক্তব্য সেই জঘন্য ফ্যাসিস্ট পার্টিগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় ১৯৩০-এ বিশেষতঃ জার্মান এবং ইতালিতে যারা ক্ষমতায় এসেছিল।
কিন্তু ১৯৩০এর সেই ফ্যাসিবাদী শক্তির বক্তব্যের সঙ্গে মিল আছে বলেই কি একইভাবে বর্তমানে ফ্যাসিবাদের বিপদ মাথাচাড়া দেবে এমনটা ধরে নেওয়া যায়?
এবিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তার ওপর আলোচনা আজকের পাবলিক মিটিঙ-এর বিষয়।
কতকগুলো জিনিস দেখে আমারা ভাবতে পারি যে হ্যাঁ, বিপদটা সত্যই আছে। যেমন:
·         ১৯৩০-র মত এখন অর্থনৈতিক সংকট বেশিরভাগ মানুষের জীবনে দারুণভাবে আঘাত করছে।
·         ১৯৩০-এ যেমন ইহুদিদেরকে আর্ন্তজাতিক পুঁজির প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত করে তাদেরকে বলির পাঁঠা বানানোহয়, বলসেভিজমের বিপদের বিপরীতে রেখে ফ্যাসিবাদকে জাস্টিফাই করা হয়  সেভাবে আজকে মুসলিমদের অথবা আরবকে নয়তো অভিবাসী(ইমিগ্র্যান্টস্‌)দেরকেই দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে যারা নাকি আমাদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে যারাই নাকি আজকের পৃথিবীর সমস্ত কষ্টের মূলে
·         ১৯৩০-র মত এখনও এই অতি-দক্ষিণপন্থী চিন্তা ভাবনার প্রতি প্রায়শই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা দেখা যায় ক্ষুদ্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগর হস্তশিল্পী বা ব্যবসাদারদের যে অংশটা অর্থনৈতিক সংকটের ফলে বিধ্বস্ত এবং শ্রমিকশ্রেণির একটা অংশের মধ্যেও এটা দেখা যাচ্ছে।
·         বর্তমানে বিশ্বের নানা প্রান্তে এমনকি ১৯৩০-র চাইতেও বেশি করে এই অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির বিকাশ ঘটছে এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর প্রবণতাই বেড়ে চলেছে। যেমন:
-        হল্যান্ডে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বিরোধী (ইউরোসেপটিক), ইসলাম বিদ্বেষী ফ্রীডম পার্টি সেখানকার লিব্যারাল এবং ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে মিলিজুলি সরকার গঠন করেছে যেটা ২০১০ থেকে এই বছর অব্দি টিকে আছে।
-        ২০১০-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভি. ওরবান প্রতিষ্ঠা করেন এক কর্তৃত্বপ্রধান (অ্যথেরিটিরিয়ান) সরকার যেটা গনতান্ত্রিক বিরোধী পক্ষের মতে গনতন্ত্রকে রসাতলে পাঠিয়েছে। এটা সত্যিই যে সেই সরকার শুধু যে শ্রমজীবি মানুষের ওপর কঠোর আক্রমণ নামিয়েছে তাই নয়, গনতান্ত্রিক পদ্ধতির অন্তর্গত অনেককিছুকেই অবদমিত করেছে।  
-        অস্ট্রিয়ায় ২০০৮-র নির্বাচন সেদেশের দুই প্রধান অতি দক্ষিণপন্থী দল যথা মুভমেন্ট ফর অস্ট্রিয়াজ ফিউচার এবং ফ্রিডম পার্টিকে ২৯ শতাংশ ভোট এনে দিয়েছে।
-        সংকটের দ্বারা সাংঘাতিকভাবে পর্যুদস্ত গ্রীসে গত জুনের ইলেকসনে ঘোষিত ফ্যাসিস্ট গোল্ডেন ডন মোট ভোটের ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ টা সীট দখল করেছে। এই দল অভিবাসীদের ভয় দেখানোতে লিপ্ত;এরা লাইভ টিভি প্রোগ্রামে অন্য একজন রাজনীতিককে চড় মেরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
-        ইউ.এস.এ.তে টি পার্টি দক্ষিণপন্থীদের একটা প্রভাবশালী শক্তি। এরা অত্যন্ত পশ্চাদপদ চিন্তাভাবনা প্রচার করে; যেমন এদের দাবী বিদ্যালয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের মতানুসারী সৃষ্টি তত্ত্ব (Creationism)পড়াতে হবে; অর্থাৎ সোজা কথায় বিবর্তনের তত্ত্বকে খারিজ করতে হবে।
এমনকি যেসব দল নিজেদেরকে অতি দক্ষিণপন্থী বলে দাবী করে না তারাও কম যায় না। সুইজারল্যান্ডে পপুলিস্ট ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন অফ দ্য সেন্টারের একটা বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে একটা সাদা ভেড়া একটা কালো ভেড়াকে তাড়া করছে। এখানে কালো ভেড়া হল আরবী এবং রোমানিয়দের প্রতীক। এদেরকে এদেশে সবকিছুতেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
 এই সমস্ত উদাহরণ এবং ব্যাখ্যা থেকে বর্তমানে ফ্যাসীবাদের বিপদকেই যুক্তিসিদ্ধ বলে মনে হতে পারে।
তবে এইটুকু আলোচনাতেই আমরা সন্তুষ্ট থাকবো না। ১৯৩০ এবং বর্তমান পর্যায়ের মধ্যে তুলনা বা বিভিন্ন উপাদান যেমন সংকট বা জেনোফোভিক এবং রেসিস্টদের কিছুটা সাফল্য, অতি দক্ষিণপন্থীদের অগ্রগতি ইত্যাদি যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন আমাদের কাজ হবে এইসব উপাদানগুলোকে সমাজ-গতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং তারও মধ্যে আবার বুরজোয়া এবং প্রলেতারিয়েতের মধ্যেকার ক্ষমতার ভারসাম্যের মধ্যে রেখে বিচার করা।
 
১৯৩০-র সময়কালে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের পিছনে কী ছিল?
আমরা আগেই পুঁজিবাদের সংকটের বিষয়টা বলেছি। তবে কয়েকটা দেশে পুঁজিবাদী আধিপত্যের একটা বিশেষ রূপ হিসাবে ফ্যাসিবাদের এই দ্রুত উত্থানের কারণ খুঁজতে গেলে সংকট ছাড়াও একটা মৌলিক উপাদানকে বিবেচনায় আনতেই হবে:
এটা হল ১৯১৭-২৩ এই সময়কালে সংঘটিত প্রলেতারিয় বিপ্লবের পরাজয়। শ্রমিকশ্রেণির এত গভীর পরাজয় আগে কখনই হয়নি।  কেননা প্রতিবিপ্লবী শক্তি শ্রমিকশ্রেণির কাছ থেকে কেড়ে নিতে পেরেছিল শ্রমিকশ্রেণির দুই প্রধান হাতিয়ার: তাদের সংগঠন এবং প্রলেতারিয় সচেতনতা।এই পরাজয়ের প্রকাশ ঘটে রুশ বিপ্লবের ক্রমঅধঃপতনের ভেতর দিয়ে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাত করার প্রয়াসে বিপ্লবী সংগ্রাম যে দেশে যত বেশি বিকশিত হয়েছে সেখানে এই পরাজয় তত বেশি সুস্পষ্ট ছাপ রেখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যেমন দেখেছি, সেই ধরণের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের একটা বিশেষরূপের মধ্যে দিয়ে পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টিগুলো।
এই পরাজয় ইতিহাসের দীর্ঘতম এবং গভীরতম প্রতিবিপ্লবের জন্ম দেয়। এই প্রতিবিপ্লবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এই যে  এটা বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের কথামত চলতে প্রোচিত করতে পেরেছিল। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধে প্রলেতারিয়েতকে কোন না কোন পক্ষে সামিল করতে পারাটা এরই চূড়ান্ত প্রকাশ।
২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোতে আমরা তিনধরণের আর্থসামাজিক-সংগঠনের মডেল দেখতে পাই। তিনটি মডেলই পুঁজিবাদী এবং প্রতিক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করাটা সেসময় সারা বিশ্বেই পুঁজিবাদের একটা সাধারণ প্রবণতা ছিল। এই তিনটে মডেল হল:
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ
স্টালিনিস্ট রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ
ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ।
প্রথমটার সঙ্গে অন্য দুটোর তফাৎ পরিষ্কার। এখন এটা বলাই যায় যে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিচালনা এবং শ্রমিকশ্রেণির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার জন্য প্রথম ধরণের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ অন্য দুটোর চাইতে বেশি কার্যকর।
 
কেন সেসময় কিছু পুঁজিবাদী দেশ ফ্যাসিস্ট ছিল?
 
ঠিক স্ট্যালিনিস্ট স্টেট (সোভিয়েত ইউনিয়ন)-র মতই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র (জার্মানি, ইতালি)ও শ্রমিকশ্রেণিকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় গনতান্ত্রিক কলাকৌশল খারিজ করে দিয়েছিল এবং এটা বুরজোয়াদের কাছে কোন সমস্যাই ছিল না।
প্রকৃতপক্ষে (বিশেষত: USSR এবং জার্মানে) বিপ্লবের পরাজয়ের সাথে সাথে সাংগঠনিক ও চেতনাগত দিক থেকে নিঃশেষিত শ্রমিকশ্রেণিকে আলাদাভাবে বিভ্রান্তির বেড়াজালে মোহগ্রস্ত করার কোন প্রয়াস আর দরকার ছিল না। দরকার ছিল খোলাখুলি হিংস্র একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপের সাহায্যে এই পরাজয়কে দীর্ঘায়িত করা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া অবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটে মুখ থুবরে পড়া জাতীয় পুঁজির স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য জার্মান এবং ইতালিতে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের রাজনীতিকে গ্রহণ করে। এসব দেশে বুরজোয়াদের আরেকটা নতুন যুদ্ধ সংগঠিত করা দরকার হয়ে পড়েছিল।প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং/ অথবা যে তাচ্ছিল্য তাদের সে সময় সহ্য করতে হয় তারই শোধ নেবার নাম করে এই যুদ্ধের প্রস্তুতি তারা করে। ১৯২০-র শুরু থেকেই ফ্যাসিস্টরা এই মতামত প্রচারের শীর্ষে ছিল।
এই দুই দেশে বৃহৎ পুঁজির সমর্থন পুষ্ট হয়ে, গনতান্ত্রিক উপায়েই গনতন্ত্র থেকেই ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল। 
 
আমরা বলেছি শ্রমিকশ্রেণির গভীর পরাজয় উক্ত দেশগুলোয় ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায় আসার  অন্যতম শর্ত। বুরজোয়ারা একটা কথা প্রচার করে যে ফ্যাসিবাদী শক্তিই ১৯২০-৩০-এ শ্রমিকশ্রেণিকে পরাজিত করে। এটা ডাঁহা মিথ্যা। বুরজোয়া রাজনীতির বাম অংশ (বামপন্থীরা) যে পরাজয়ের প্রক্রিয়ার সূচনা করে, ফ্যাসিস্টরা সেই পরাজয়ের প্রক্রিয়াকেই সুসম্পূর্ণ করে। বিপ্লবের পর্বে বুরজোয়াদের প্রতিনিধি হয়েছিল সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলো যারা শ্রমিকশ্রেণি এবং তার আন্তর্জাতিকতার নীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এরা শ্রমিকশ্রেণিকে বুরজোয়াদের স্বার্থে যুদ্ধে সামিল হওয়ার আহ্বান জানায় এবং এভাবেই শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতার মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
 
সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলো এরকম ভূমিকা পালন করল কেন?  তাদের এমনটা করা কি খুব দরকার ছিল? সেসময় শ্রমিকশ্রেণি শুধুমাত্র অপরাজিত তাই নয়, পরন্তু তাদের বিপ্লবী সংগ্রাম উত্তরোত্তর বিকশিত হচ্ছে; ফলতঃ বুরজোয়াদের অবদমনের কিছু পদ্ধতি সে সংগ্রামের সামনে অকেজো হয়ে পড়ছে। ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগতি প্রতিহত করতে প্রথমেই বর্বর নিপীড়ণ চালানোটা বুরজোয়াদের কাছে আত্মহত্যার সামিল হত। পাশব শক্তির প্রয়োগ তখনই কার্যকর যখন তা প্রলেতারিয়েতকে বিভ্রান্ত করার কৌশলগুলোর একটা অংশ হিসাবে শ্রেণির কোন দুর্বলতাকে ব্যবহার করে তার সংগ্রামকে নিষ্ফল করে দেওয়া যায়, শ্রেণিকে বুরজোয়ার পাতা ফাঁদে এনে ফেলা যায়। আর এই জঘন্য কাজটা সেই রাজনৈতিক পার্টিগুলো করতে পারে যারা প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে বেইমানি করা সত্ত্বেও যাদের প্রতি শ্রেণির বিপুল অংশটার তখনও অব্দি ভরসা আছে।
সুতরাং, ১৯১৯-এর জার্মান বিপ্লবের সময়কালে পুঁজির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার প্রয়াসী শেষ রাজনৈতিক প্রতিনিধি জার্মান SPD পার্টি বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণিকে শেষ করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। একাজে সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট অংশ যারা রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল তাদের সমর্থন মেলে এবং নাৎসি সক ট্রুপ (Shock Troop)-র পূর্ববর্তী সংস্করণ নিপীড়নমূলক Freikorps (ঝটিকাবাহিনী) নামানো হয়।
 এই কারণে, শ্রমিকশ্রেণির যত শত্রু আছে যথা ডান বা বামপন্থী গনত্ন্ত্রী, অতিবাম তা গনতন্ত্রী হোক বা না হোক, পপুলিস্ট তা ফ্যাসিস্ট হোক বা না হোক, সবথেকে বিপজ্জনক শত্রু হল তারাই যারা শ্রেণিকে সুকৌশলে টুপি পরিয়ে বিপ্লবী লক্ষ্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে। আর এই কাজ প্রাথমিক ভাবে পুঁজির বাম এবং অতিবাম অংশের; সুতরাং এদের মুখোশ খোলা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পর্যায়ে পরিস্থিতিটা কী?
১৯৩০-র থেকে একটা বড় পার্থক্য সূচিত হয়েছে ১৯৬৮ থেকে ফ্রান্স এবং বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণীর নতুনভাবে সংগ্রামের পথে আসার ভেতর দিয়ে। সেইসময় থেকে শ্রেণীসংগ্রামে এক নতুন গতিমুখ খুলে গেছে। সে পথ শ্রমিকশ্রেণীর পূর্বতন পরাজয়ের পর্ব পেরিয়ে পুনরায় শ্রেণি সংগ্রামের বিকাশ ঘটানোর অভিমুখে। এটা ঠিকই যে সেসময় থেকে শ্রেণি প্রচুর বাধার সামনে পড়েছে তবু বিশ্বজুড়ে শ্রেণি গভীর এবং মৌলিক কোন পরাজয়ের সম্মুখীন হয়নি যাতে ১৯৩০-র মত আবার একটা প্রতিবিপ্লব রাজত্ব করতে পারে।
এই অর্থেই আমরা বলতে পারি ফ্যাসিজম্‌ কায়েম করার অপরিহার্য শর্তসমূহ যথা আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিতভাবে পরাজিত শ্রমিকশ্রেণি, পুঁজিবাদীদের কয়েকটা প্রধান দেশে শ্রেণির সাংগঠনিক এবং মতাদর্শগতভাবে সম্পূণভাবে চূর্ণ হয়ে যাওয়া অবস্থা বর্তমানে নেই।
বর্তমানে ফ্যাসিবাদ সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় চলে আসবার মত বিপদের ভয় শ্রমিশ্রেণির নেই; তার প্রধান বিপদ গণতন্ত্রের মায়াজাল যারা ছড়ায় তাদের নিয়ে এবং পুরোণো শ্রমিক পার্টিগুলোকে নিয়ে যারা পুরোপুরি বুর্জোয়াদের ক্যাম্পে চলে গেছে। শ্রমিকশ্রেণির পুঁজি বিরোধী সংগ্রাম এবং শ্রেণীর বিপ্লবী চরিত্রকে তুলে ধরার যেকোন প্রয়াসকে সুপরিকল্পিতভাবে শেষ করাই এইসব পার্টিগুলোর কাজ। আর লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই দলগুলোই ফ্যাসিবাদের বিপদ নিয়ে সব চেয়ে বেশি গলা ফাটাচ্ছে যাতে করে শ্রমিকশ্রেণিকে গণতন্ত্র আর বামপন্থার গাড্ডায় আটকে রাখা যায়।
১৯৩০-র ফ্যাসিস্ট দের মত একই বিষয় নিয়ে বর্তমান পপুলিস্ট পার্টিগুলোর মাথা চাড়া দেওয়ার কারণ কী?
দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার একমাত্র বিকল্প বিশ্ব প্রলেতারিয় বিপ্লব। কিন্তু প্রলেতারিয়েত সেই বিপ্লবের পথে যেতে প্রচুর বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলেই এই সব পার্টিগুলো মাথা চারা দিতে পারছে।
সুতরাং যদিও বুরজোয়ারাও এই পরিস্থিতিতে তাদের সংকট মেটানোর জন্য সর্বব্যাপী বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত করতে পারছে না, সমাজটা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের চাপে সবদিক থেকে পচনশীল অবস্থায় চলে যাচ্ছে। এই পচনশীলতা থেকেই জন্ম হচ্ছে এইধরণের দিশাহীন, জাতপাতবাদী, অন্য দেশের মানুষের প্রতি ঘৃণাপূর্ণ মতবাদের; এসবের ভিত্তিমূলে আছে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গী; আছে অপরকে প্রতিযোগী বা শত্রু ভাবা। শ্রমিকশ্রেণীসহ সমাজের একটা লক্ষণীয় অংশই এসব ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের কাজ নয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আলাদা করে কোন সংগ্রাম সংগঠিত করা বা ডিমোক্র্যাসি রক্ষার জন্য কোন বিশেষ আন্দোলন গড়ে তোলা; আমাদের কাজ এইসমস্ত কিছুর জন্য দায়ী যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধেই শ্রমিকশ্রেণির সর্বব্যাপী স্বাধীন স্বতন্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা।  
 
আই. সি.সি. ৩০ ০৬ ২০১২