২০২৬ সালের আগস্টের শেষ দিকে, নেপাল ভয়াবহ তুষারধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যা চীন‑নেপাল সীমান্তের তিব্বতের গিরং উপত্যকা থেকে নেমে এসেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যম দ্রুতই ঘটনাটিকে “প্রাকৃতিক দুর্যোগ” হিসেবে উপস্থাপন করে হিমালয়ে বসবাসের এক করুণ কিন্তু অনিবার্য পরিণতি হিসেবে। কিন্তু এমন বর্ণনা এই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণকে আড়াল করে। প্রকৃতির একটি সাধারণ ঘটনা নয়, নেপালের এই ট্র্যাজেডি পুঁজিবাদের ধ্বংসাত্মক যুক্তির একটি ঘনীভূত প্রকাশ প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক, তার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এবং পৃথিবীতে জীবনের শর্তাবলী পরিচালনা করতে তার ক্রমবর্ধমান অক্ষমতার প্রকাশ।
আইপিসিসি, নাসার আর্থ অবজারভেটরি এবং ওয়ার্ল্ড গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের মতো বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে হিমালয়ের হিমবাহ অভূতপূর্ব গতিতে গলে যাচ্ছে। ১৯৮০ সাল থেকে হিমালয় ইতোমধ্যেই তার হিমবাহের চল্লিশ শতাংশেরও বেশি ভর হারিয়েছে, এবং গলনের হার আরও দ্রুততর হচ্ছে। এটি প্রকৃতির কোনো এলোমেলো ওঠানামা নয়, বরং পুঁজিবাদী উৎপাদন দ্বারা চালিত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি ফলাফল। অনেক আগেই এঙ্গেলস সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “প্রকৃতির উপর আমাদের প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি আমাদের প্রতিশোধ নেয়” (ডায়ালেকটিক্স অব নেচার )। পরিবেশগত বিপর্যয় সম্পর্কে আইসিসির বিশ্লেষণেও এই অন্তর্দৃষ্টি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালের ট্র্যাজেডি এই বাস্তবতারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ: প্রকৃতির উপর পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত মানবসমাজের বিরুদ্ধেই ফিরে আসে।
তবে এই বিপর্যয় কেবল তুষারধসের কারণেই এত ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি। মানুষের হস্তক্ষেপও এর তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষত সীমান্তের তিব্বতীয় পাশে চীনা বুর্জোয়া শ্রেণির হস্তক্ষেপ। গত এক দশকে গিরং উপত্যকাকে চীনা পুঁজির সেবায় একটি প্রধান লজিস্টিক করিডোরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিশাল বাঁধ, নদীপ্রবাহের পরিবর্তন, সড়ক নির্মাণ এবং জলবিদ্যুৎ স্থাপনা নদীর তলদেশকে সংকুচিত করেছে, যা একটি প্রাণঘাতী ফানেল‑প্রভাব সৃষ্টি করেছে। তুষারধস আঘাত হানার পর ধ্বংসাবশেষের স্রোত আরও দ্রুত ও তীব্র হয়ে ওঠে, পথে যা পেয়েছে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। চীনা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য, যা আগাম সতর্কতা দিতে পারত, নেপালের সঙ্গে ভাগ করা হয়নি। কোনো ধরনের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বুর্জোয়া শ্রেণির গোপনীয়তা—যা সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য—একটি পূর্বানুমেয় ঝুঁকিকে গণমৃত্যুতে পরিণত করেছে।
পুঁজিবাদ এভাবেই প্রাকৃতিক ঘটনাকে সামাজিক বিপর্যয়ে রূপান্তরিত করে। গিরং‑এ নির্মিত অবকাঠামোগুলো নিরাপত্তা বা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য তৈরি হয়নি। এগুলো নির্মিত হয়েছে বাণিজ্যিক স্বার্থে, জলবিদ্যুৎ আহরণের জন্য, এবং সীমান্ত প্রবাহের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। মার্কস যেমন বলেছেন, পুঁজিবাদের যুক্তি হলো “accumulation for accumulation’s sake, production for production’s sake.” এই অন্ধ, সম্প্রসারণবাদী গতিশীলতা যুক্তিসঙ্গত পরিবেশগত পরিকল্পনাকে অসম্ভব করে তোলে। তিব্বতে চীনের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলিকে—যার মধ্যে ১৯৮টি বাঁধ নির্মিত হয়েছে বা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে—‘সবুজ জ্বালানি’র উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ ভঙ্গুর পার্বত্য পরিবেশে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, নদীর নিম্নপ্রবাহে বন্যার আশঙ্কা তীব্র করতে পারে এবং পরিবেশগত ব্যবস্থার ভারসাম্যকে বিপন্ন করতে পারে। পুঁজিবাদ তার পরিবেশবিধ্বংসী চরিত্র থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থে ‘সবুজ’ হয়ে উঠতে পারে না। বরং, তার ধ্বংসের বোঝাকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঠেলে দেয়।
নেপালের এই বিপর্যয় আরও একটি দিক উন্মোচিত করে: সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আজ পৃথিবীর পরিবেশগত কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করেছে। তিব্বত মালভূমি হলো “এশিয়ার জলাধার”—যা দুই বিলিয়ন মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নদীগুলোর উৎস। এই জলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ চীন–ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি কৌশলগত সম্পদ। চীনের পরিকল্পিত মেতো বাঁধ—যা থ্রি গর্জেসের তিনগুণ বড়—কেবল একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়, বরং একটি সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র। জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য সামরিক গোপনীয়তায় পরিণত হয়। অবকাঠামো ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়। পচনের পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী উত্তেজনা আরও বিশৃঙ্খল, আরও অনির্দেশ্য, এবং বেসামরিক জনগণের জন্য আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। আইসিসি যেমন বলে, পুঁজিবাদ “নিজের পায়ে পচে যাচ্ছে,” এবং এই পচন রাষ্ট্রগুলোর সেই অক্ষমতায় প্রকাশ পায় যে তারা সহযোগিতা করতে পারে না—যদিও মানবজীবন তার উপর নির্ভর করে। নেপালের বিপর্যয় এই গতিশীলতার সরাসরি ফলাফল। এটি দেখায় কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিবেশগত ব্যবস্থাকে আধিপত্যের যন্ত্রে পরিণত করে।
সবসময়ই যেমন হয়, শিকার হয় সবচেয়ে দরিদ্র ও সবচেয়ে দুর্বলরা। নেপালের গ্রামবাসী, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, এবং নিম্নপ্রবাহে বসবাসকারী ছোট ছোট সম্প্রদায়কে পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার বেদিতে বলি দেওয়া হয়েছে। তাদের যন্ত্রণা মার্কসবাদ এবং আমাদের সংগঠনের বিশ্লেষণের একটি মৌলিক শিক্ষা পুনরায় নিশ্চিত করে: পরিবেশগত বিপর্যয়কে পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না। আমরা বহুবার জোর দিয়ে বলেছি, এই সমস্যাকে কেবল পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যথেষ্ট নয়… আমাদের বুঝতে হবে এগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্কের সংযোগ। নেপালের বিপর্যয় কেবল পরিবেশগত নয়—এটি রাজনৈতিক, সাম্রাজ্যবাদী এবং পদ্ধতিগত।
নেপালের এই বিপর্যয় তাই মানবতার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রকাশ করে সেই গতিশীলতাগুলোকে যা পুঁজিবাদ তার পচনের পর্যায়ে মুক্ত করে দেয়: মুনাফা ও শিল্পোন্নয়নের দ্বারা চালিত পরিবেশগত অস্থিতিশীলতা; সমন্বয়হীন পুঁজিবাদী উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট অবকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা; সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা যা প্রকৃতি ও তথ্যকে অস্ত্রে পরিণত করে; সম্মিলিত হুমকির মুখে বৈশ্বিক পক্ষাঘাত; এবং শোষিত ও নিপীড়িতদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গণযন্ত্রণা। পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে ভুলভাবে পরিচালনা করছে না; এটি প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। পুঁজিবাদ সমন্বয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে না; এটি সমন্বয় করতে অক্ষম। পুঁজিবাদ মানবজীবন রক্ষা করতে সংগ্রাম করছে না; এটি কাঠামোগতভাবে তা করতে অক্ষম। পুঁজিবাদের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ মানে পরিবেশগত বিপর্যয়ের বৈশ্বিকীকরণ।
এই প্রাণঘাতী ঘূর্ণাবর্তের মুখে বুর্জোয়া শ্রেণির কোনো সমাধান নেই। তাদের “পরিবেশগত রূপান্তর” একটি ধোঁকাবাজি। তাদের “আন্তর্জাতিক সহযোগিতা” একটি মুখোশ। তাদের “উন্নয়ন” হলো ধ্বংস। কেবলমাত্র প্রলেতারিয়েত—তার সংগ্রাম, তার সংহতি, এবং তার ঐতিহাসিক মিশনের মাধ্যমে—একটি ভিন্ন যুক্তি আরোপ করতে পারে: সম্মিলিত দায়িত্ববোধের যুক্তি, বৈশ্বিক সমন্বয়ের যুক্তি, মানবিক প্রয়োজনের জন্য উৎপাদনের যুক্তি, এবং পুঁজির ধ্বংসাত্মক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে বিচ্ছেদের যুক্তি। শ্রমকে অবশ্যই পুঁজিবাদী শোষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে: এটি মানবজাতির টিকে থাকার পূর্বশর্ত। কেবলমাত্র প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবই মানবজাতিকে রক্ষা করবে।
নেপালের এই বিপর্যয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়। এটি পচনশীল পুঁজিবাদের উৎপাদন—প্রকৃতির সঙ্গে তার ধ্বংসাত্মক সম্পর্কের, তার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার, এবং পৃথিবীতে জীবনের শর্তাবলী পরিচালনা করতে তার ক্রমবর্ধমান অক্ষমতার ফল। আমাদের কাজ স্পষ্ট: বুর্জোয়া শ্রেণির মিথ্যাচারকে উন্মোচিত করা, পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণগুলো প্রকাশ করা, প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদকে রক্ষা করা, এবং ঘোষণা করা যে কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রামই মানবতার জন্য একটি দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
SN (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
Source: https://en.internationalism.org/content/17852/nepal-deadly-logic-capitalism-decomposition